স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয়

স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয় : ভূপৃষ্ঠে বাংলাদেশ এক স্বাধীন রাষ্ট্র। ভারতীয় উপমহাদেশে পূর্ববঙ্গ নামে অভিহিত দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারতীয় উপমহাদেশ হিন্দুস্থান ও পাকিস্তান নামে দুটি রাষ্ট্রে বিভক্ত হওয়ার পরমুহূর্ত থেকেই পাকিস্তানের পশ্চিমাঞ্চলের রাজনৈতিক পাঞ্জাবি নেতৃবৃন্দ বিশেষত সামরিক শাসকগণ পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলের বাঙালি জনগোষ্ঠীকে অবজ্ঞা অবহেলা করতে শুরু করে।

History Gurukul [ ইতিহাস গুরুকুল ] GOLN logo - স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয়

পূর্ববঙ্গের বাঙালি জনগণের ওপর দুঃসহ শোষণ, নিপীড়ন, বঞ্চনা, অত্যাচার শেখ মুজিবুর রহমানের মনে বিদ্রোহের আগুন জ্বালিয়ে দেয়। মহাত্মা গান্ধী, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, শরৎ চন্দ্র বসু, নেতাজী সুভাষ বসু, মুসলিম লীগ নেতা আবুল হাশিম, শেরেবাংলা এ. কে. ফজলুল হক, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী প্রমুখ নেতার গণসম্পৃক্ত প্রগতিশীল আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে এবং এদের কারো কারো প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে এসে শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতির স্বাধীনতা ও মুক্তির লক্ষ্যে নিজকে প্রস্তুত করেন।

বঙ্গবন্ধু আন্দোলনের চূড়ান্তপর্যায় শুরু হয় ১৯৭০ সালে পাকিস্তান সামরিক শাসকদের অধীনে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনের পর। নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী হয়।

আওয়ামী লীগ পার্লামেন্টারি পার্টি কর্মকৌশল নির্ধারণ এবং জাতীয় পরিষদের আসন্ন অধিবেশনে দেশের খসড়া শাসনতন্ত্র প্রণয়নের বিষয়ে ১ মার্চ ঢাকার হোটেল পূর্বাণীতে আলোচনারত ছিল। হঠাৎ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেন। বাঙালি জনগণ এতে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে।

দেশি বিদেশি সাংবাদিকগণ বঙ্গবন্ধুর কাছে জানতে চান তিনি এ অবস্থায় স্বাধীনতা ঘোষণা করবেন কি না। তিনি জবাবে বলেন, অধিবেশন স্থগিতের বিষয়ে তাঁর সঙ্গে প্রেসিডেন্ট কোনো আলোচনা করেননি। স্বাধীনতা ঘোষণার প্রশ্নে তিনি সবাইকে অপেক্ষা করতে বলেন এবং পূর্ব বাংলায় অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন।

বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চ ঢাকার তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে প্রদত্ত ঐতিহাসিক ভাষণে জনগণকে পাকিস্তানি সামরিক চক্রের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সতর্ক থাকতে বলে ঘোষণা করেন, “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।”

পাকিস্তানি শাসকবৃন্দ বাঙালি নেতার হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে অনীহা প্রকাশ করে। সমঝোতা আলোচনার নামে তারা কালক্ষেপণ করতে থাকে। ষড়যন্ত্রমূলকভাবে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে অতর্কিতে নিরস্ত্র বাঙালি জাতির ওপর সারা পূর্ববঙ্গে সেনাবাহিনী হত্যাযজ্ঞ, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ ইত্যাদি শুরু করে। এ পরিপ্রেক্ষিতে ঊনিশ শ’ একাত্তর সালের ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে ইপিআর ওয়্যারলেসের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা-বার্তা দ্বারা সাবেক পূর্ব পাকিস্তান তথা পূর্ববঙ্গ স্বাধীন রাষ্ট্ররূপে ঘোষিত হয়।

স্বাধীন বাঙালি জাতির রাষ্ট্র :

বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণার কথা সমগ্র পৃথিবী অবহিত হয়। উনিশ শ’ সত্তর সালের ৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসনে ঐতিহাসিক বিজয়ের প্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধু নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী রাজনৈতি দল আওয়ামী লীগের কাছে ক্ষমতা করতে তৎকালীন পাকিস্তান সামরিক শাসকবৃন্দের প্রতি আহ্বান জানান।

পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টোর দল পাকিস্তান পিপলস পার্টি এবং সামরিক জান্তা ব্যতীত সেখানকার অন্যান্য গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল বঙ্গবন্ধুর এই আহ্বানকে গণতান্ত্রিক, নিয়মতান্ত্রিক এবং সঙ্গত বলে বিবৃতি প্রদান করে। কিন্তু পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান শাসনতন্ত্র প্রণয়ন উপলক্ষে ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ গণপরিষদ অধিবেশন আহ্বান করেও তা বাতিল করেন। এতে পাকিস্তানের তৎকালীন শাসকচক্রের ষড়যন্ত্র-চক্রান্তের আভাস পাওয়া যায় এবং তাদের মুখোশ উন্মোচিত হয়ে পড়ে।

চক্রান্তকারীদের ভয়াবহ পরিকল্পনা যতই গোপনে করা হোক না কেন বঙ্গবন্ধুও তার নিজস্ব উৎসের মাধ্যমে সেসব পরিকল্পনার বিষয় জানতে পারতেন এবং তার দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও পর্যালোচনা দ্বারা সামরিক শাসকদের চাতুর্য বুঝতে পেরেছিলেন। তার পশ্চিম পাকিস্তানি রাজনৈতিক বন্ধুরাই বঙ্গবন্ধুকে সামরিক শাসকচক্রের কুমতলব সম্পর্কে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিতেন।

বঙ্গবন্ধুর এসব সুহৃদদের মধ্যে খান ওয়ালি খান, গউস বক্স বিজেঞ্জো, মিয়া মাহমুদ আলী কাসুরি, খান আবদুল গাফফার খান, মিয়া ইফতিখার উদ্দিন, মানকি শরীফের পীর প্রমুখের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ্য। তৎকালীন প্রচারমাধ্যম এবং দৈনিক পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত এঁদের বিবৃতি থেকে এসব কথা জানা যায়।

জেনারেল ইয়াহিয়া ৩ মার্চ গণপরিষদ অধিবেশন বাতিল ঘোষণার আগে পহেলা মার্চ (১৯৭১) আওয়ামী লীগ পার্লামেন্টারি পার্টি ঢাকার হোটেল পূর্বাণীতে কর্মকৌশল নির্ণয় এবং ৬-দফার আলোকে পাকিস্তানের খসড়া শাসনতন্ত্র প্রণয়নের বিষয়ে আলোচনায় মিলিত হয়েছিল। জেনারেল ইয়াহিয়া বেতারভাষণের মাধ্যমে অধিবেশন বাতিল ঘোষণাকালে বলেন, “… পশ্চিম পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল অর্থাৎ পাকিস্তান পিপলস পার্টি এবং আরও কয়েকটি রাজনৈতিক দল ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে যোগদান না করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে।

এ ছাড়া ভারত সৃষ্ট সাধারণ উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি সার্বিক অবস্থাকে আরও জটিল করে তুলেছে। অতএব আমি জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান পরবর্তী কোনো তারিখের জন্য স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। শাসনতন্ত্র প্রণয়নের ব্যাপারে সমঝোতায় উপনীত হবার জন্য রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে আরও কিছু সময় দেওয়া উচিত। এ সময় দেওয়ার পর আমি একান্তভাবে আশা করি যে, তারা একে কাজে লাগাবেন এবং সমস্যার একটি সমাধান বের করবেন।

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের এই ঘোষণায় ঢাকা ও সারা পূর্ববাংলার শহর-বন্দর গ্রামের জনগণ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এ সময় হোটেল পূর্বাণীতে আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের সদস্যগণের সঙ্গে বৈঠকরত ছিলেন। এরপর তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে হোটেলে মিলিত হন। অধিবেশন স্থগিত করাকে পাকিস্তানি শাসকচক্রের ষড়যন্ত্র বলে তিনি উল্লেখ করেন।

সাংবাদিকগণ বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে পরবর্তী পদক্ষেপ সম্বন্ধে জানতে চাইলে তিনি উপস্থিত সবাইকে বলেন, “অপেক্ষা করুন।” সাংবাদিকদের অন্য প্রশ্নের জবাবে বঙ্গবন্ধু জানান, জাতীয় পরিষদ অধিবেশন স্থগিত করার পূর্বে তার সঙ্গে আলোচনা করা হয়নি। অনির্দিষ্টকালের জন্য অধিবেশন স্থগিত করাকে তিনি দুর্ভাগ্যজনক বলেন। জনগণের ন্যায়সঙ্গত অধিকার রক্ষার জন্য আওয়ামী লীগের সংসদীয় দল এবং জনগণ যে কোনো ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত বলেও তিনি জানান।

দল-মত নির্বিশেষে সর্বমহল থেকে জেনারেল ইয়াহিয়ার ঘোষণায় প্রতিবাদ ওঠে। এমনকি দক্ষিণপন্থী পূর্ব পাকিস্তান কনভেনশন মুসলিম লীগের সভাপতি শামসুল হুদা অধিবেশন স্থগিত ঘোষণায় দুঃখ প্রকাশ করেন এবং জনাব ভুট্টো ও তার দলের একগুঁয়ে • মনোভাবকে এ জন্য দায়ী করেন।

ঢাকায় অবস্থানরত খান আবদুল ওয়ালি খানের নেতৃ ত্বাধীন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) কেন্দ্রীয় ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে অধিবেশন মুলতবি রাখার সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানো হয়। ন্যাপ কেন্দ্রীয় কমিটির সভায় যোগদানকারী পাঞ্জাব, সিন্ধু, বেলুচিস্তান ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের নেতৃবৃন্দও ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

অধিবেশন স্থগিত ঘোষণার প্রতিবাদে বঙ্গবন্ধু ঢাকায় ২ মার্চ এবং সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে ৩ মার্চ হরতাল আহ্বান করেন। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানি শাসকচক্রকে সাবধান করে দিয়ে বলেন, পূর্ব পাকিস্তানে আগুন জ্বললে তারাও এ থেকে রেহাই পাবেন না। ২ মার্চ সান্ধ্য আইন জারি করা হয়েছিল। কিন্তু বিক্ষুব্ধ জনতা কারফিউ অমান্য করে মিছিল বের করলে সামরিক জান্তা জনতার ওপর গুলিবর্ষণ করে। এতে ৩ জন নিহত এবং কমপক্ষে অর্ধ শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়।

গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য দেশবাসীর ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত গণরায়কে ব্যর্থ করতে প্রতিক্রিয়াশীল মহল তৎপর হয়ে ওঠে। বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চ পর্যন্ত সংগ্রামের কর্মসূচি ঘোষণা করেন এবং কতিপয় নির্দেশাবলি প্রদান করেন। ঢাকার পল্টন ময়দানে আয়োজিত জনসভায়

বঙ্গবন্ধু জনপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করা পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানে খাজনা-ট্যাক্স প্রদান বন্ধ রাখা এবং লুটতরাজ ও দাঙ্গা-হাঙ্গামা প্রতিরোধ করার জন্য জনসাধারণের প্রতি আহ্বান জানান। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে জনতা ইতিবাচক সাড়া দেয়। ওই দিনই বঙ্গবন্ধু অসহযোগের ঘোষণা দেন।

অন্য দিকে ওই দিন প্রেসিডেন্ট ভবনের এক ঘোষণায় বলা হয় যে, জাতীয় পরিষদের সকল পার্লামেন্টারি গ্রুপের ১২ জন নির্বাচিত নেতাকে ১০ মার্চ ঢাকায় মিলিত হওয়ার জন্য প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ব্যক্তিগতভাবে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। ঐ সম্মেলনে যাদের আমন্ত্রণ জানানো হয় তাঁরা হলেন:

  • শেখ মুজিবুর রহমান (আওয়ামী লীগ)
  • জুলফিকার আলী ভুট্টো (পিপিপি)
  • খান আবদুল কাইয়ুম খান (মুসলিম লীগ)
  • মওলানা মুফতি মাহমুদ (জমিয়াতে উলেমায়ে ইসলাম-হাজারভী)
  • খান আবদুল ওয়ালি খান (ন্যাপ)
  • মওলানা শাহ আহমদ নূরানি (জমিয়াতে উলেমায়ে পাকিস্তান)
  • আবদুল গফুর আহমদ (জামায়াতে ইসলামী)
  • মোহাম্মদ জামাল কোরেজা (কনভেনশন মুসলিম লীগ)
  • নূরুল আমিন (পিডিপি)
  • মেজর জেনারেল জামালদার
  • মালিক জাহাঙ্গীর খান (উপজাতীয় এলাকার এম.এন. এদের প্রতিনিধি)। ৭

আওয়ামী লীগ সভাপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৩ মার্চ রাতেই প্রেসিডেন্টের ঘোষিত আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেন। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, বঙ্গবন্ধু ৩ মার্চ পল্টনে এক বিশাল জনসভায় ভাষণ দিয়ে জনতার উদ্দেশে দিকনির্দেশনা দেন। তিনি ৬ মার্চ সকাল ৬টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত হরতাল পালনের নির্দেশ দেন। তিনি বলেছিলেন, ‘সাত দিনের মধ্যে সরকারি মনোভাব পরিবর্তন না হলে রেসকোর্সে আমি আমার ভাষণ দিয়ে দিব।

…..৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে ২টায় জনসভা অনুষ্ঠিত হবে। সেখান হতে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।

আওয়ামী লীগের ৪ মার্চ এক মুলতবী সভায় বঙ্গবন্ধু তার ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা তুলে ধরেন এবং ৫ মার্চ থেকে তার নির্দেশে পূর্ব পাকিস্তানের সরকারি-বেসরকারি কার্যক্রম নিয়ন্ত্রিত হতে থাকে। বঙ্গবন্ধুর সভাপতিত্বে তার বাসভবনে ৭ মার্চ সকালে আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী পরিষদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ঐতিহাসিক ৭ মার্চ দুপুরের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রেসকোর্সে আয়োজিত জনসভায় ঘোষণা করেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ (পরিশিষ্ট-১ দ্রষ্টব্য)

পল্টন ময়দানে ৯ মার্চ বিকেলে ন্যাপ প্রধান মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ঘোষণা করেন, আগামী ২৫ মার্চের মধ্যে ৪ দফা দাবি মেনে না নিলে তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে এক হয়ে ১৯৫২ সালের ন্যায় বাঙালির স্বাধীনতার জন্য সর্বাত্মক সংগ্রাম শুরু করবেন।

অপর দিকে পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি বি. এ. সিদ্দিকী নবনিযুক্ত গভর্নর লে. জেনারেল টিক্কা খানকে শপথ গ্রহণ করাতে অস্বীকৃতি জানালে জেনারেল ইয়াহিয়া খান টিক্কা খানকে ‘খ’ অঞ্চলের সামরিক আইন প্রশাসক নিযুক্ত করেন। এতে পশ্চিম পাকিস্তানেও রাজনৈতিক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। ভুট্টোর ষড়যন্ত্র থেকে পাকিস্তান রক্ষার জন্য ন্যাপ (ওয়ালি), জমিয়াত উলামায়ে পাকিস্তান, তেহরিক-ই-ইশতেকলালসহ বিভিন্ন দল বিভিন্ন সভায় দাবি জানায়।

বঙ্গবন্ধুর আহ্বানের পরিপ্রেক্ষিতে শান্তিপূর্ণভাবে পূর্ব পাকিস্তানে অসহযোগ আন্দোলন চলতে থাকে। পাকিস্তানি শাসকচক্রের বর্বরতার পরিপ্রেক্ষিতে সামগ্রিক পরিস্থিতি অনিশ্চয়তার মধ্যে পতিত হওয়ায় জাতিসংঘের মহাসচিব উ থান্ট ১১ মার্চ বাংলাদেশ থেকে জাতিসংঘের সব কর্মচারীকে সদর দপ্তরে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেন। বঙ্গবন্ধু এতে ক্ষুব্ধ হয়ে উ থান্টের উদ্দেশে বলেছিলেন, বাংলাদেশের মানুষও এই পৃথিবীর অধিবাসী। তাদের প্রতিও আপনার দায়িত্ব আছে।

অসহযোগ আন্দোলনের ৫ম দিনে ৬ মার্চ শত শত উত্তাল মিছিল বঙ্গবন্ধুর ঢাকাস্থ বাড়ি (ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কে অবস্থিত) অভিমুখে ছুটে যায়। রাজনৈতিক দলের নেতৃ বৃন্দও বঙ্গবন্ধুর হাতে ক্ষমতা অর্পণের আহ্বান জানান। এ দিন সরকারি কর্মকর্তাগণও (সিএসপি, ইপিসিএস) এক সভায় শেখ মুজিবুরের নির্দেশ মেনে চলার শপথ নেন।

বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সারা পূর্ব পাকিস্তানে সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। পাকিস্তান ন্যাপের সভাপতি খান আবদুল ওয়ালি খান ১৩ মার্চ ঢাকায় এসে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে প্রায় দেড় ঘণ্টা বৈঠক করেন। ১০ তার আগে ওয়ালি খান সাংবাদিকদের সামনে বঙ্গবন্ধুর দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছিলেন।

বঙ্গবন্ধু ১৪ মার্চ তার নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে জানান, ইয়াহিয়া খান ঢাকায় এসে তাঁর সঙ্গে আলোচনা করতে চাইলে সে আলোচনায় তিনি যোগ দিতে প্রস্তুত। তবে এ আলোচনা তাঁর ও আমার মধ্যেই হবে। বঙ্গবন্ধু আরো বলেছিলেন, “আমরা পরাজিত হতে পারি না। কারণ আমাদের ভবিষ্যৎ বংশধরদের একটি স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক হিসেবে স্বাধীনতা ও মর্যাদাসহকারে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা বিধানের জন্য প্রয়োজনবোধে আমাদের প্রতিটি লোক মৃত্যুবরণে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। ১৯

অসহযোগ আন্দোলনকে সুশৃঙ্খল ও সুসংগঠিতভাবে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে নতুন কর্মসূচি ৩৫-দফা নির্দেশাবলি ঘোষিত হয়। এসব নির্দেশ ১৫ মার্চ থেকে কার্যকর হবে বলে ঘোষণায় বলা হয়। (পরিশিষ্ট-২)।

বঙ্গবন্ধুর এই ৩৫-দফা নির্দেশাবলি ছিল একটি ভিন্নধর্মী শাসনপ্রক্রিয়া। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক বিষয়াবলি নিয়ে বঙ্গবন্ধু দেশ শাসনের যে নীতিমালা ও নির্দেশ প্রদান করেন তা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে গ্রহণযোগ্য ছিল। স্বাধীন বাংলাদেশের ভিত এসবের মধ্যে নিহিত ছিল।

টানটান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশে ঢাকায় ১৬ মার্চ জেনারেল ইয়াহিয়া খান ও বঙ্গবন্ধুর মধ্যে দীর্ঘ আলোচনা হয়। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, খোন্দকার মোশতাক আহমদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, এ. এইচ. এম. কামারুজ্জামান ও ড. কামাল হোসেন। ইয়াহিয়ার সঙ্গে ছিলেন পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের সাবেক প্রধান বিচারপতি কর্নেলিয়াস, লে. জেনারেল টিক্কা খান, লে. জেনারেল পীরজাদা, মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা, মেজর জেনারেল ওমর ও মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী।

সকাল ১০-৩০ মিনিট থেকে বিকেল ৩-৩০ মিনিট পর্যন্ত বৈঠক চলে। আলোচনার পর অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের বঙ্গবন্ধু বলেন, আমরা আমাদের কথা ইয়াহিয়াকে বলেছি, আলোচনা শুরু হয়েছে। তাদের আলোচনা চলবে। আপনারা অপেক্ষা করুন। আলোচনার পাশাপাশি রাজপথের আন্দোলনও অব্যাহত থাকবে ১২ বঙ্গবন্ধু ঘোষিত ৩৫-দফা নির্দেশাবলি এবং তদসংক্রান্ত ব্যাখ্যা অনুযায়ী পূর্ব পাকিস্তানের সরকারি-বেসরকারি সব কাজকর্ম স্বাভাবিক গতিতে চলতে থাকে।

প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু ১৭ মার্চ এক ঘণ্টা আলোচনা করেন। আলোচনার পর তিনি বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট আমাদের দাবিগুলো বিশ্লেষণ করে দেখার জন্য সময় চেয়েছেন। আমি তাকে সময় দিয়েছি। আমাদের ৪-দফা মানতে হবে। দেশের সংবিধানের ভিত্তি হবে ৬-দফা।’ উল্লেখ্য, বঙ্গবন্ধু তার ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে চার দফা দাবি পেশ করেছিলেন। এগুলো ছিল-

(১) সামরিক বাহিনীর সমস্ত লোককে ব্যারাকে ফিরিয়ে নিতে হবে;
(২) যেভাবে নিরীহ নাগরিকদের হত্যা করা হয়েছে তার তদন্ত করতে হবে;
(৩) সামরিক আইন তুলে নিতে হবে;
(৪) জনগণের প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে।

এক ঘোষণায় ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবসকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ প্রতিরোধ দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। বঙ্গবন্ধু ২৩ মার্চ ছুটির দিন ঘোষণা করেন।

মুজিব-ইয়াহিয়ার কোনো আলোচনা ১৮ মার্চ হয়নি। তবে ন্যাপ-প্রধান খান আবদুল ওয়ালি খানের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় দফা আলোচনা হয়েছিল। ঢাকার অদূরে ১৯ মার্চ জয়দেবপুরে ঘটে যায় স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রথম সশস্ত্র বিদ্রোহ।

পাকিস্তান সেনাবাহিনী জয়দেবপুরে নিরস্ত্র জনতার ওপর গুলি চালালে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ব্যাটালিয়নের বাঙালি সৈনিক ও অফিসারগণ তৎকালীন মেজর শফিউল্লার নেতৃত্বে অস্ত্রসমর্পণে অস্বীকৃতি জানায়। বঙ্গবন্ধু নিরস্ত্র জনতার ওপর গুলি বর্ষণের তীব্র নিন্দা করেন। ওই দিনই মুজিব ইয়াহিয়া তৃতীয় দফা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

বৈঠক দেড় ঘণ্টা চলার পর বঙ্গবন্ধু সাংবাদিকদের বলেন, আলোচনায় কিছু অগ্রগতি হয়েছে, আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। আমরা আর পিছু হটতে পারব না।

এদিন ঢাকাস্থ সোভিয়েত কন্সাল জেনারেল পেত্রোভ ভলতিন বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে তার সঙ্গে দেখা করে তাকে জানান, পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতিতে সোভিয়েত সরকার ও জনগণ খুবই উদ্বিগ্ন।

বঙ্গবন্ধু ও প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ২০ মার্চ চতুর্থ দিনের মতো বৈঠকে বসেন। সমগ্র পাকিস্তানের জনগণ মুজিব-ইয়াহিয়ার আলোচনার দিকে চেয়ে থাকলেও সঙ্কট উত্তরণের কোনো লক্ষণ সেদিন পর্যন্ত দেখা যায়নি।

স্বাধীন বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ ২৩ মার্চ প্রতিরোধ দিবসের সকালে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিটি সরকারি-বেসরকারি অফিস, আদালত ও বাসভবনে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনের আহ্বান জানায়। ১৮

অন্য দিকে অবসরপ্রাপ্ত দুজন ক্যাপ্টেন নওয়াব হোসেন এবং আশরাফ আহমদ এক বিবৃতিতে বঙ্গবন্ধুর আশীর্বাদ নিয়ে আর্মি-পুলিশসহ প্রাক্তন সৈনিকদের একটি যৌথ কমান্ডের অধীনে ট্রেনিং গ্রহণের আহ্বান জানান। ১৯

অসহযোগ আন্দোলনের বিংশতিতম দিবস ছিল ২১ মার্চ। এদিন মুজিব-ইয়াহিয়ার মধ্যে অনির্ধারিত বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় সোয়া এক ঘণ্টার এ আলোচনার বিষয় সম্বন্ধে ব্যাখ্যা দিতে বঙ্গবন্ধু অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেন। তবে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তার এই সাক্ষাৎকার বিস্ময়কর কিংবা আকস্মিক নহে।

পশ্চিম পাকিস্তানি নেতা খান আবদুল ওয়ালি খান, মিয়া মমতাজ দৌলতানা, সরদার শওকত হায়াত খান, মওলানা মুফতি মাহমুদ এবং গাউস বক্স বিজেঞ্জো ২১ মার্চ নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বৈঠকে বসেন। নেতৃবৃন্দ সামরিক শাসন প্রত্যাহার ও গণপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে অভিন্ন মত প্রকাশ করেন।

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার আমন্ত্রণে পিপলস পার্টি প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টো ২১ মার্চ ঢাকায় এসে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দুই ঘণ্টাব্যাপী এক আলোচনায় মিলিত হন।

প্রেসিডেন্ট ভবনে ২২ মার্চ মুজিব-ইয়াহিয়া-ভুট্টো প্রথমবারের মতো বৈঠকে বসেন। আলোচনার মাঝপথে প্রেসিডেন্টের জনসংযোগ কর্মকর্তার মারফত দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের জানানো হয় যে, পাকিস্তানের দুই অংশের নেতাদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বৃহত্তর সমঝোতার লক্ষ্যে প্রেসিডেন্ট ২৫ মার্চ আহূত জাতীয় পরিষদ অধিবেশণ স্থগিত করেছেন।

বৈঠক শেষে বঙ্গবন্ধু বাইরে এসে বলেন, তিনি প্রেসিডেন্টকে সুস্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন চারটি শর্ত পূরণ এবং উত্থাপিত দাবি বাস্তবায়ন ছাড়া জাতীয় পরিষদ অধিবেশনে বৃহত্তম দল আওয়ামী লীগের যোগ দেওয়া সম্ভব নয়।

পরের দিন ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবস উপলক্ষে পূর্ব পাকিস্তানের কোথাও পাকিস্তানের পতাকা ওড়েনি। অপরপক্ষে কেন্দ্রীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের আহ্বানে পূর্ব পাকিস্তানের সর্বত্র স্বাধীন বাংলার পতাকা ওড়ানো হয়েছিল। ঢাকা বৃটিশ হাইকমিশন ও সোভিয়েত কনসুলেটে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করা হয়। মাইকে “আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি” গানটি বাজানো হয়।

হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে অবস্থানকারী ভুট্টোর অবস্থানের ওপরেও স্বাধীন বাংলার পতাকা উড্ডীন ছিল। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া কঠোর সেনাপ্রহরায় কুর্মিটোলা ক্যান্টনমেন্টে ২৩ মার্চ সকালে জুলফিকার আলী ভুট্টো, লে. জেনারেল পীরজাদার সঙ্গে বৈঠক করেন। ইয়াহিয়া-ভুট্টোর এই তৎপরতায় ষড়যন্ত্রের আভাস ফুটে ওঠে। ওদিকে চট্টগ্রাম বন্দরে ‘এসডি সোয়াত’ জাহাজে আনীত অস্ত্রশস্ত্র নামাতে বাঙালি শ্রমিকরা বাধা দেয়। ২১

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ইয়াহিয়া ২৪ মার্চ কোনো বৈঠকে বসেননি। ইয়াহিয়ার উপদেষ্টা এবং বঙ্গবন্ধুর সহযোগী নেতৃবৃন্দের মধ্যে বৈঠক হয়েছিল। এটা আসলে ছিল লোকদেখানো আয়োজন। সেনা অভিযান গোপনে শুরু হয়ে গিয়েছিল। পশ্চিম পাকিস্তানের ছোট ছোট দলগুলোর ৫ নেতা সম্মিলিতভাবে প্রথমে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে পরে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং ২৪ ও ২৫ মার্চ তারা একে একে ঢাকা ত্যাগ করেন। এতে জনগণের সন্দেহ আরো ঘনীভূত হয়।

পশ্চিম পাকিস্তানে পৌঁছেই খান ওয়ালি খান করাচি বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের বলেন, মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সমস্যাবলির ব্যাপারে সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার একমাত্র আইনগত ও উপযুক্ত স্থান জাতীয় পরিষদ। পরিষদের বাইরে এই ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত গৃহীত হইলে তাহার দল কোনোমতেই উহা গ্রহণ করিবে না। ২৩

প্রেসিডেন্ট ভবনে আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টাদের সঙ্গে ২৪ মার্চ সন্ধ্যায় বৈঠক শেষে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিকদের বলেন, অনির্দিষ্টকাল অপেক্ষা করা চলে না। তাদের আর বলার কিছু নেই এবং আর কোনো আলোচনারও প্রয়োজন নেই। ২৪

আলোচনা শেষ হলেও প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে প্রত্যাশিত ভাষণ আসেনি। মানব ইতিহাসের এক নৃশংসতম কালরাত্রি নেমে আসে ২৫ মার্চ পাকিস্তান শাসনামলের সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট রাত্রি ২৫ মার্চ।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের দুপুর পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু অসীম ধৈর্য ধারণ করে প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়ার সঙ্গে আলোচনা করেন। আলোচনা শেষ না করেই জেনারেল ইয়াহিয়া ঐদিন অপরাহ্ন ৫টা নাগাদ সকলের অগোচরে ঢাকা ত্যাগ করেন। সন্ধ্যার পর ঢাকা শহর থমথমে হয়ে যায়। রাত বাড়তে থাকে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মধ্যে সাজ সাজ রব লক্ষ করা যায়।

বঙ্গবন্ধুর কাছে প্রতি মুহূর্তে এসব খবর পৌঁছুতে থাকে। বঙ্গবন্ধু তার ঘনিষ্ঠ সহচর তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, এ. এইচ. এম. কামারুজ্জামান, ক্যাপ্টেন এম. মনসুর আলী, অন্যান্য ছাত্র-শ্রমিকনেতা এবং আওয়ামী লীগের অন্যান্য নেতা কর্মীকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নজর এড়িয়ে থাকতে বলেন এবং নিজে তার বাসভবনেই অবস্থান করেন।

পাকিস্তান সামরিক জান্তা ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে হিংস্র অভিযান শুরু করলে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশমতো ইপিআর ওয়্যারলেস থেকে তার স্বাধীনতার ঘোষণার বাণী প্রচারিত হয়। পুনঃপ্রচারিত এই ঘোষণার বাণী আমার নিজেরও রেডিওতে শোনার সৌভাগ্য হয়েছিল ২৭ মার্চ বিকেলে। গ্রন্থকারের মতো আরো অনেকেই শুনেছেন স্বাধীনতা ঘোষণার এই বাণী। তাদের মধ্যে স্পষ্টতই তৎকালীন ক্যাডার সার্ভিসের প্রয়াত সহকর্মী রেজাউল হায়াতের নাম স্মরণ করতে পারছি।

প্রাসঙ্গিকভাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাংলাদেশ গণপরিষদে ১৯৭২ সালের। ১০ এপ্রিল প্রদত্ত ভাষণ থেকে সংশ্লিষ্ট অংশ উদ্ধৃত হলো। নিচের উদ্ধৃতাংশে বঙ্গবন্ধু নিজেই তাঁর স্বাধীনতা ঘোষণা সম্পর্কে পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করেছেন।

“…বর্বর ইয়াহিয়ার সেনাবাহিনীকে অসহায় ও নিরস্ত্র ৭ কোটি বাঙালির উপর কুকুরের মতো লেলিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সেনাবাহিনী যদি যুদ্ধ ঘোষণা করতো, তবে আমরা সে যুদ্ধের মোকাবিলা করতে পারতাম। কিন্তু তারা অতর্কিতে ২৫ মার্চ তারিখে আমাদের আক্রমণ করলো। তখন বুঝতে পারলাম যে, আমাদের শেষ সংগ্রাম শুরু হয়ে গেছে। আমি ওয়্যারলেসে চট্টগ্রামে জানালাম বাংলাদেশ আজ থেকে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র।

এই খবর প্রত্যেককে পৌছিয়ে দেওয়া হোক, যাতে প্রতিটি থানায়, মহকুমায়, জেলায় প্রতিরোধ সংগ্রাম গড়ে উঠতে পারে। সেই জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশও দিয়েছিলাম। এই ব্যাপারে আত্মসচেতন হতে হবে। দেশবাসী জানেন, একই তারিখে দেশের বিভিন্ন জায়গায় প্রতিরোধ আন্দোলন শুরু হয়েছিল। এটা হাওয়ার উপর থেকে হয় নাই। যদি কোনো নির্দেশ না থাকতো তবে কেমন করে একই সময়ে একই মুহূর্তে সব জায়গায় সংগ্রাম শুরু হলো? …”

ওপরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণের উদ্ধৃতি থেকে এ কথা সুস্পষ্ট যে, বঙ্গবন্ধু তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ও সজাগ মন দিয়েই পাকিস্তানি হানাদার শাসকশ্রেণীর কুমতলব সম্বন্ধে বুঝতে পেরেছিলেন। বঙ্গবন্ধু তার সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতা, পারিপার্শ্বিক ঘটনাপ্রবাহ এবং ব্যক্তিগত বিভিন্ন উৎস থেকে প্রাপ্ত তথ্যে উপলব্ধি করেছিলেন যে, পাকিস্তানি সামরিক জান্তা সহজে এবং গণতান্ত্রিক রীতিনীতি মেনে বাঙালি জাতির নির্বাচিত প্রতিনিধিবৃন্দের হাতে শাসনক্ষমতা হস্তান্তর করবে না।

বঙ্গবন্ধুও পাকিস্তানি শাসকবৃন্দ কর্তৃক সৃষ্ট পরিস্থিতিতে কীভাবে এগিয়ে যেতে হবে তা স্থির করে নিয়েছিলেন তিনি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে সমগ্র বাঙালি জাতির ভাগ্য নির্ধারণে এবং ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার সংলাপে বসেছিলেন। সদিচ্ছা নিয়ে প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়ার সঙ্গে সংলাপে বসতে সম্মত হয়েছিলেন।

পাকিস্তানি সামরিক শাসকবৃন্দ এবং পাকিস্তানের পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলি ভুট্টোর নেতৃত্বে সমগ্র পাকিস্তানে বিশেষত পূর্ববঙ্গের রাজনীতির অঙ্গনে যে অস্থিতিশীল ও অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল তাতে সংলাপে বসার মতো অনুকূল পরিবেশ ছিল না। তাই, পাকিস্তানি সামরিক শাসক ক্ষমতা হস্তান্তরে বাহ্যিকভাবে সংলাপের কর্মসূচি নিলেও তা ছিল লোকদেখানো ও প্রচারণামূলক এবং বহির্বিশ্বকে ধোঁকা দিতে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু ছিলেন নিয়মতান্ত্রিকতায় বিশ্বাসী রাজনৈতিক নেতা।

পঁচিশে মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধু রাত সাড়ে বারোটা পর্যন্ত টেলিফোনে কয়েকজন বিদেশি সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলেছিলেন। রাত দেড়টার দিকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদস্যরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তার বাসভবন থেকে গ্রেফতার করেছিল। গ্রেফতার হওয়ার কিছু আগে বঙ্গবন্ধু ওয়ারলেসে চট্টগ্রামে বার্তা প্রেরণ করে জানিয়েছিলেন, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন’। (পরিশিষ্ট-৩)

পূর্ব বাংলা হলো বাংলাদেশ। ভারতীয় উপমহাদেশের যে ছোট্ট ভূখণ্ড পূর্ববঙ্গ তথা বারো ভূঁইয়ার বাংলা নামে অভিহিত ছিল তাকে ১৯৪৭ সালে পূর্ব পাকিস্তান নাম দেওয়া হয়েছিল। দ্বিজাতিতত্ত্বের বিষ বাঙালি জাতিকে জর্জরিত করে ফেলে। বাংলার শেষ নওয়াব সিরাজউদ্দৌলা যেমন এই জনপদকে স্বাধীন-সার্বভৌম দেখতে চেয়েছিলেন তেমনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তান তথা পূর্ববঙ্গ এবং এই মাটিতে বসবাসকারী বাঙালি অধিবাসীকে পাকিস্তানি পাঞ্জাবি শাসকবৃন্দের কবল থেকে মুক্ত ও স্বাধীন করতে চেয়েছিলেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ববঙ্গকে অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন। আর এ জন্যই সাম্প্রদায়িক পাকিস্তান শাসকচক্রের কোপানলে পড়েন তিনি। বঙ্গবন্ধু হাল ছাড়েননি তার সঙ্কল্প বাস্তবায়ন থেকে। আন্দোলন-সংগ্রামে জয়ী হয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা সম্পর্কিত বার্তা প্রচারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দ্বিজাতিতত্ত্বের অপফসল পূর্ব পাকিস্তান ‘বাংলাদেশ’ নামে সমগ্র পৃথিবীতে পরিচিত হয়। বাংলাদেশ আত্মপ্রকাশ করে। কিন্তু পাকিস্তানি সেনাবাহিনী স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশকে দখল করে রাখে দীর্ঘ নয় মাস।

এই নয় মাস বাংলাদেশের আবালবৃদ্ধবণিতা বঙ্গবন্ধুর ডাকে দেশকে শত্রুর দখলমুক্ত করতে অসম যুদ্ধে ব্যাপৃত থাকে। প্রতিবেশী বন্ধুরাষ্ট্র ভারত বাংলাদেশের প্রায় এক কোটি বাঙালি শরণার্থীকে আশ্রয়, খাদ্য ও অন্যান্য সাহায্য-সহযোগিতা দান করে। পাকিস্তান বাহিনীর মোকাবিলা করতে গঠিত হয় বাংলাদেশের প্রথম সরকার কুষ্টিয়ার মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায়। বৈদ্যনাথতলার নামকরণ করা হয় মুজিবনগর। মুজিবনগরের নামানুসারে বাংলাদেশ সরকারকে অভিহিত করা হতো ‘মুজিবনগর সরকার” নামে।

এই মুজিবনগর সরকার বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা সংবলিত বার্তা ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন করে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অতর্কিত আক্রমণে ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থান গ্রহণকারী আওয়ামী লীগের নির্বাচিত এমএনএ এবং এমসিএ-গণ দলের সেক্রেটারি জেনারেল তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে একটি মন্ত্রিসভা গঠন করেন।

মুজিবনগর সরকার পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপরাষ্ট্রপতি (বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি), তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী, ক্যাপ্টেন এম. মনসুর আলী, খোন্দকার মোশতাক আহমদ এবং এ. এইচ. এম. কামারুজ্জামানকে মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেন।

প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ১৯৭১ সালের ১১ এপ্রিল স্বাধীন বাংলা বেতারে ভাষণ দিয়ে বাংলাদেশের অস্তিত্বের কথা এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি করে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিসভা গঠনের কথা সমগ্র পৃথিবীকে জানিয়ে দেন। কুষ্টিয়ার সীমান্ত অঞ্চলে গঠিত মন্ত্রিসভার সব সদস্য এবং বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিযুক্ত সৈয়দ নজরুল ইসলাম শপথ গ্রহণ করেন। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্তৃক অধিকৃত অঞ্চল উদ্ধারে মুক্তিযুদ্ধের কর্মসূচি গ্রহণ করেন।

বাংলাদেশকে হানাদার পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কবলমুক্ত করতে মুক্তিযুদ্ধ তথা জনযুদ্ধ বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়। এই ইতিহাসের সঙ্গে প্রথম বাংলাদেশ সরকারের ভূমিকা ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা, শরণার্থীদের বিভিন্ন সমস্যা মেটানো, অধিকৃত বাংলাদেশে প্রশাসন ব্যবস্থাপনা সামলানো, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ, খাদ্য-রসদ সংগ্রহ, চিকিৎসাসেবা দান, পররাষ্ট্রবিষয়ক তৎপরতা সচল রাখা ইত্যাদি যাবতীয় রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ায় প্রথম বাংলাদেশ সরকারের যেসব মন্ত্রী, কর্মকর্তা, কর্মী, কর্মচারী সংশ্লিষ্ট ছিলেন বাংলাদেশের ইতিহাসে তাদের নাম স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

সেই সব মানুষের নাম নিচে ‘প্রথম বাংলাদেশ সরকার’ উপশিরোনাম অংশে উল্লেখ করা হয়েছে। এর বাইরে আরো নাম হয়তো আছে, সব মনে পড়ছে না। কখনো মনে পড়লে কিংবা কোনো গবেষক, ইতিহাসবিদ, পাঠক স্মরণ করিয়ে দিলে সেসব নাম গ্রন্থের পরবর্তী সংস্করণে সংযুক্ত করা হবে।

স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস - জাতীয় স্মৃতিসৌধ বাংলার স্বাধীনতার প্রতীক
স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস – জাতীয় স্মৃতিসৌধ বাংলার স্বাধীনতার প্রতীক

প্রথম বাংলাদেশ সরকার (মুজিবনগর সরকার) :

পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান দূরভিসন্ধিমূলকভাবে কালক্ষেপণ করেন। পরবর্তীতে সরকারের পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের জানানো হয় যে, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া রেডিওতে ভাষণ দিয়ে বৈঠকের ফলাফল সম্বন্ধে জানাবেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। জেনারেল ইয়াহিয়া খান এবং পিপলস পার্টি প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টো চুপিসারে ঢাকা ত্যাগ করেন।

ঢাকা ত্যাগের প্রাক্কালে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সাথে গোপন বৈঠক করে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক অভিযানের সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে গিয়েছিলেন।

উল্লেখ্য, ২৪ মার্চ তারিখ থেকেই পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আগত রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ঢাকা ত্যাগ করতে শুরু করেছিলেন। প্রেসিডেন্ট এবং ভুট্টো ঢাকা ত্যাগের পরপর ২৫ মার্চ রাতের অন্ধকারে প্রথমে ঢাকায় ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে এক অভিযানে নিরীহ নিরস্ত্র বাঙালি ছাত্র-শ্রমিক-জনতার ওপর অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সদস্যরা ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারা নির্বিচারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাস’ পিলখানার ইপিআর-এর সদর দফতর এবং ঢাকার পুলিশ লাইন রাজারবাগসহ শহরের যত্রতত্র আক্রমণ চালায়।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অতর্কিত আক্রমণে ছাত্র-ছাত্রী পুলিশ-আনসারসহ অসংখ্য পথচারী নিহত হয়। সেনাবাহিনী কোনো কোনো রাজনৈতিক নেতার বাড়িতেও আক্রমণ পরিচালনা করেছিল। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বাসা, বুদ্ধিজীবী, কবি, সাহিত্যিক-লেখক, সাংবাদিকের আবাসেও হানা দিয়েছিল। ঢাকায় অবস্থানরত বিদেশি সাংবাদিকসহ অন্যান্য কাজে আসা অতিথিবৃন্দ পাকিস্তানি সামরিক শাসকদের এই কাণ্ডকারখানা দেখে স্তম্ভিত হয়ে যায়।

পাকিস্তান আর্মির পক্ষ থেকে বিদেশি নাগরিক এবং সাংবাদিকদের ঢাকা ত্যাগ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। সেনাবাহিনীর লোকেরা এসব অতিথি এবং সাংবাদিকদের বিশেষ ব্যবস্থায় ঢাকা বিমানবন্দর পর্যন্ত নিয়ে গিয়ে বিমানে তুলে দিয়েছিল। এত কিছুর মধ্যেও দু-একজন সাংবাদিক সামরিক বাহিনীর সদস্যদের চোখ এড়িয়ে ঢাকায় আত্মগোপন করে থেকে যেতে পেরেছিলেন।

এদের মধ্যে ডেইলি টেলিগ্রাফের তরুণ সাংবাদিক সাইমন ড্রিং-এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখ্য। নিউ ইয়র্ক টাইমসের সংবাদদাতা সিডনি শনবার্গ এবং সাইমন ড্রিং-এর প্রতিবেদনের বরাতে সমগ্র পৃথিবীর গণতন্ত্রকামী মানুষ প্রথম জানতে পারে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানি শাসকদের তথা সেনাবাহিনীর বর্বরতম গণহত্যার কথা।

প্রথমে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকায় তারপর দেশের সর্বত্র পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অভিযান পরিচালিত হয়। হাজার হাজার নিরীহ বাঙালিকে শহর-বন্দর গ্রামের জনপদে অত্যাচার-নির্যাতন এবং হত্যা করা হয় এবং পূর্ববঙ্গের সর্বত্রই ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়ার সঙ্গে লুটপাটও করা হয়।

সাধারণ মানুষ এই বর্বরোচিত আক্রমণের মুখে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে ছোটাছুটি করতে থাকেন। রাজনৈতিক নেতাকর্মীগণ নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে প্রতিবেশী ভারতের সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলো বেছে নেন। শত বাধাবিপত্তির মাঝেও আওয়ামী লীগের প্রথম সারির নেতৃবৃন্দ পরস্পরের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করতে সক্ষম হন। তাদের বেশিরভাগ জনপ্রতিনিধি তৎকালীন কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় সমবেত হন।

পাকিস্তানি বর্বর সেনাবাহিনীর আক্রমণে পূর্ববঙ্গের অতিষ্ঠ জনগণও প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য সে সময় রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃত্বের আশা করেছে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে প্রথমেই আওয়ামী লীগ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আক্রমণের মোকাবিলা করতে যুদ্ধক্ষেত্রে অবতীর্ণ হয়। এই মোকাবিলার ডাক বঙ্গবন্ধু অনেক আগেই দিয়ে রেখেছিলেন।

বঙ্গবন্ধু তার প্রত্যেক বক্তৃতা-বিবৃতি, সভা-সমিতিতে শত্রুর মোকাবিলা করতে জাতিকে সতর্ক বার্তা দিতেন বিগত ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ তার বিখ্যাত ভাষণেও তিনি বলেছিলেন, “তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে। তিনি বাঙালি জনগণের মনে প্রেরণা দিয়ে বলেছিলেন, “ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো”।

বঙ্গবন্ধুর এসব আহ্বানে সমগ্র বাঙালি জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অতর্কিত আক্রমণের মুখে স্তম্ভিত জাতির সামনে আলোকবর্তিকারূপে প্রতিভাত হয় কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় আওয়ামী লীগের নির্বাচিত নেতৃবৃন্দের সমাবেশ। এই সমাবেশ আনুষ্ঠানিক এবং ঐতিহাসিক অধিবেশনে রূপ নেয়।

এই অধিবেশনে ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র প্রচার করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। আওয়ামী লীগের নির্বাচিত এমএনএ এবং এমপিএরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি ও সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপরাষ্ট্রপতি এবং প্রথম বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিসভা নির্বাচিত করে।

মন্ত্রিসভায় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হন তাজউদ্দীন আহমদ। মন্ত্রিসভার অন্যান্য সদস্য ছিলেন ক্যাপ্টেন এম. মনসুর আলী, খন্দকার মোশতাক আহমদ এবং এ. এইচ. এম কামারুজ্জামান সরকার গঠনের এই সংবাদ স্বাধীন বাংলা বেতারে ১১ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে প্রচারিত হয়। সরকার গঠিত হওয়ার পর ১৭ এপ্রিল মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। এই সরকার মুজিবনগর সরকার নামে পরিচিত।

মুজিবনগর নামকরণ করা হয়েছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামানুসারে। মুজিবনগর নামে অভিহিত বৈদ্যনাথতলায় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সদস্যবৃন্দ শপথ গ্রহণ করেছিলেন ১৭ এপ্রিল এক সংক্ষিপ্ত বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে। বিপুলসংখ্যক বিদেশি অতিথি এবং সাংবাদিক এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

এই সরকার ১৯৭১ সালের ২২ ডিসেম্বর পর্যন্ত মুজিবনগরে অবস্থান করে। তবে পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বাংলাদেশ সরকার তথা মুজিবনগর সরকার নিরাপত্তার জন্য পশ্চিমবঙ্গের কোলকাতার থিয়েটার রোডে অস্থায়ী কার্যালয় স্থাপন করে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা এবং প্রশাসনিক ও অন্যান্য জাতীয় আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক কর্মকাণ্ড সম্পন্ন করেছেন।

মুজিবনগর সরকার গঠন, বাংলাদেশ সরকারের সর্বপ্রথম সাংগঠনিক কাঠামো ছিল নিম্নরূপ। পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনানুযায়ী কাঠামো এবং দায়িত্ব বণ্টনের কারণে সরকারের অবয়বে কিছু পরিবর্তন/ পরিবর্ধন হয়েছিল।

মুজিবনগর সরকারের মহামান্য রাষ্ট্রপতি: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

মুজিবনগর সরকারের মহামান্য অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি : সৈয়দ নজরুল ইসলাম

মুজিবনগর সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী : জনাব তাজউদ্দীন আহমদ

মুজিবনগর সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্য :

খোন্দকার মোশতাক আহমদ : পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আইন ও সংসদীয় বিষয়াদি

জনাব এম. মনসুর আলী : অর্থ, বাণিজ্য, শিল্প মন্ত্রণালয়

জনাব এ. এইচ. এম. কামারুজ্জামান : স্বরাষ্ট্র, ত্রাণ ও পুনর্বাসন, কৃষি ও খাদ্য মন্ত্রণালয়

মুজিবনগর সরকারের মুক্তিবাহিনী :

কর্নেল (অব.) এম.এ.জি. ওসমানী”, এমএনএ : প্রধান সেনাপতি কর্নেল (অব.) আবদুর রব”, এমএনএ. চিফ অব স্টাফ

গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ. কে. খন্দকার : ডেপুটি চিফ অব স্টাফ, বিমানবাহিনী প্রধান

মুজিবনগর সরকারের বিশেষ দায়িত্বে নিযুক্ত ব্যক্তিবর্গ :

অধ্যাপক ইউসুফ আলী এম.এন.এ সচিব, কেন্দ্রীয় সাহায্য ও পুনর্বাসন কমিটি এবং চেয়ারম্যান, বোর্ড অব ইয়ুথ ক্যাম্প

ব্যারিস্টার আমীর-উল-ইসলাম এম.এন.এ : ভলান্টিয়ার কোর

মতিউর রহমান এম.এন.এ বাণিজ্য বিষয়ক আবদুল মান্নান এম.এন.এ : স্বাধীন বাংলা বেতার, প্রকাশনা উপদেষ্টা

মোহাম্মদ কামরুজ্জামান এম.এন.এ শরণার্থী শিক্ষক বিষয়ক

মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী সচিবালয়ে নিযুক্ত কর্মচারীবৃন্দ :

রুহুল কুদ্দুস সেক্রেটারি জেনারেল

হোসেন তওফিক ইমাম : ক্যাবিনেট সচিব

খন্দকার আসাদুজ্জামান : অর্থসচিব

আবদুস সামাদ প্রতিরক্ষা সচিব

মাহবুবুল আলম চাষী : পররাষ্ট্রসচিব (নভেম্বর, ১৯৭১ পর্যন্ত)

এ. ফতেহ (বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত) আনোয়ারুল হক খান : তথ্যসচিব

আবদুল খালেক : সংস্থাপন সচিব ও পুলিশপ্রধান নুরুদ্দীন আহমদ কৃষিসচিব

জে.জি. ভৌমিক রিলিফ কমিশনার ডা. টি. হোসেন পরিচালক, স্বাস্থ্যসচিব

মুজিবনগর সরকারের কূটনৈতিক দায়িত্ব :

বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী : বহির্বিশ্বে বিশেষ দূত হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী : নয়াদিল্লিতে মিশন প্রধান

এম. হোসেন আলী: কোলকাতার মিশন প্রধান

মুজিবনগর সরকারের পরিকল্পনা কমিশন :

ড. মোজাফফর আহমদ চৌধুরী : পরিকল্পনা কমিশনের প্রধান

ড. মোশাররফ হোসেন পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য

ড. আনিসুজ্জামান: পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য

সৈয়দ আলী আহসান : পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য

ড. সারোয়ার মুরশিদ পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ড. স্বদেশ রঞ্জন রায় পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য

মুজিবনগর সরকারের অন্যান্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা :

ডা. আসহাবুল হক, এমসিএ বাংলাদেশ রেড ক্রস প্রধান ড. এ. আর মল্লিক বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির প্রধান

উইং কমান্ডার (অব.) এস. আর. মির্জা: ইয়ুথ ক্যাম্পের পরিচালক এম. আর. আখতার মুকুল: পরিচালক (রেডিও)

স্বাধীন বাংলাদেশ ল

আবদুল জব্বার। পরিচালক (চলচ্চিত্র)

সৈয়দ কামরুল হাসান পরিচালক, আর্টস ও ডিজাইন

মুজিবনগর সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্যগণের ব্যক্তিগত স্টাফ :

কাজী লুৎফুল হক অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির একান্ত সচিব

ড. ফারুক আজিজ খান প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব

আলী তারেক : পি.আর. ও

মেজর নূরুল ইসলাম : প্রধানমন্ত্রীর স্টাফ অফিসার

মামুনুর রশিদ: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর একান্ত সচিব

রবীন্দ্রনাথ ত্রিবেদী পি.আর.ও (উপসচিব, বাংলাদেশ সরকার) সাদত হোসাইন অর্থমন্ত্রীর একান্ত সচিব জোয়াদুল করিম: কোলকাতা মিশনে তথ্য অফিসার আমিনুল হক বাদশা: কোলকাতা মিশনে তথ্য অফিসার কামাল সিদ্দিকী : পররাষ্ট্রমন্ত্রীর একান্ত সচিব কুমার শংকর হাজরা : পি.আর.ও. ক্যাপ্টেন নূর : প্রধান সেনাপতির এডিসি

লে. শেখ কামাল প্রধান সেনাপতির এডিসি মোস্তফা আল্লামা : প্রধান সেনাপতির পি.আর.ও আকবর আলি খান : উপসচিব, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ওয়ালিউল ইসলাম উপসচিব, সংস্থাপন ড. খসরুজ্জামান চৌধুরী : উপসচিব, স্বরাষ্ট্র এম. এইচ. সিদ্দিকী : ট্রান্সপোর্ট অফিসার

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ:

জনযুদ্ধ ইতঃপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, পাকিস্তানি সামরিক জান্তার অতর্কিত আক্রমণের পরিপ্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগ অতি দ্রুত সংগঠিত হয়ে বাংলাদেশ সরকার গঠন করে। এই সরকার তার অস্থায়ী কার্যালয় ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কোলকাতায় স্থাপন করে। পাকিস্তান সেনাবাহিনী বঙ্গবন্ধুর স্বাধীন বাংলাদেশের অধিকাংশ অঞ্চলে আক্রমণ চালিয়ে দখল করে রেখেছিল।

পাকিস্তানি সামরিক শাসকদের আক্রমণের প্রত্যুত্তরে বঙ্গবন্ধু ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন ঘোষণা করে তৎকালীন ইপিআর-এর ওয়্যারলেসে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর সর্বত্র প্রচারের জন্য স্বাধীনতার ঘোষণা সম্পর্কিত বার্তা প্রেরণ করেছিলেন। এই বার্তা প্রচারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তান সেনাবাহিনী তাদের আক্রমণ বিস্তৃত করে।

 

মুক্তিযুদ্ধ

 

তাদের আক্রমণ প্রতিহত করতে এবং স্বাধীন বাংলাদেশের ভূখণ্ড পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কবল থেকে মুক্ত করতে ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল প্রতিরোধযুদ্ধ পরিচালনার কর্মসূচি আরো নিবীড় করে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আক্রমণে কিংকর্তব্যবিমূঢ় আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দকে সেনাবাহিনীর বাঙালি অফিসার ও জওয়ান এবং স্থানীয় বেসামরিক প্রশাসনকে (কমিশনার, জেলা প্রশাসক, সাবডিভিশনাল কর্মকর্তাদের)

যুদ্ধপ্রস্তুতির জন্য পৃথকভাবে ডাক দিতে হয়নি। বিখ্যাত ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর আহ্বানের পর সমগ্র বাঙালি জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনায় তেমন কঠিন অবস্থার সম্মুখীন হতে হয়নি। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এক অনন্য রূপ ধারণ করে। বাংলাদেশ সরকার দেশকে শত্রুমুক্ত করতে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করলে তা জনযুদ্ধের রূপ নেয়। এ সম্পর্কে আমার রচিত এবং প্রকাশিত “বাংলাদেশ সরকার ১৯৭১” গ্রন্থে বিশদ আলোচনা রয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে তৎকালে সমগ্র বাংলাদেশকে কয়েকটি জোনে বিভক্ত করা হয়েছিল। এসব জোনের প্রশাসনিক দায়িত্বে যেসব ব্যক্তিকে নিয়োগ করা হয়েছিল, তারা অসাধারণভাবে বাংলাদেশের ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে থাকবেন। প্রশাসনিক দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিগণ হলেন

১. দক্ষিণ-পূর্ব জোন-১ (চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, ফেনী): চেয়ারম্যান জনাব নূরুল ইসলাম চৌধুরী এম.এন.এ. এবং প্রশাসক এস. এ. সামাদ (প্রাক্তন সিএসপি)

২. দক্ষিণ-পূর্ব জোন-২ (ঢাকা, কুমিল্লা, নোয়াখালী) : চেয়ারম্যান আলহাজ জহুর আহমদ। চৌধুরী, এম.এন.এ এবং প্রশাসক কাজী রফিব উদ্দিন আহমদ (প্রাক্তন সিএসপি;

৩. পূর্ব জোন (হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার): চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) এম. এ. রব, এম.এন.এ (চিফ অব স্টাফ);

8. উত্তর-পূর্ব জোন-১ (সিলেট, সুনামগঞ্জ) চেয়ারম্যান দেওয়ান ফরিদ গাজী এম.এন.এ. এবং প্রশাসক এস. এইচ চৌধুরী;

৫. উত্তর-পূর্ব জোন-২ (ময়মনহিহ, টাঙ্গাইল) চেয়ারম্যান শামসুর রহমান খান এম.এন.এ এবং প্রশাসক লুৎফর রহমান:

৬. উত্তর জোন-২ (রংপুর জেলা) চেয়ারম্যান মতিউর রহমান এম.এন. এ এবং প্রশাসক ফয়েজ উদ্দিন আহমদ (ইপিসিএস, ডিসি দিনাজপুর);

৭. পশ্চিম জোন-১ (দিনাজপুর, বগুড়া) : চেয়ারম্যান আবদুর রহিম এম.সি.এ এবং প্রশাসক এ. এ. কাশেম (ইপিসিএস);

৮. পশ্চিম জোন-২ (রাজশাহী জেলা) : চেয়ারম্যান আশরাফুল ইসলাম এম.সি.এ. এবং প্রশাসক জহুরুল ইসলাম ভূঁইয়া (ইপিসিএস);

৯. দক্ষিণ-পশ্চিম জোন-১ (পাবনা-কুষ্টিয়া) : চেয়ারম্যান আবদুর রউফ চৌধুরী এম.সি.এ. এবং প্রশাসক মো: শামসুল হক (ইপিসিএস, ডিসি কুষ্টিয়া);

১০. দক্ষিণ-পশ্চিম জোন-২ (যশোর-ফরিদপুর) : চেয়ারম্যান ফণীভূষণ মজুমদার এম.সি.এ এবং প্রশাসক বি বি বিশ্বাস (ইপিসিএস)।

১১. দক্ষিণ জোন (বরিশাল, পটুয়াখালী, খুলনা) চেয়ারম্যান আবদুর রব সেরনিয়াবাত এম.এন.এ. এবং প্রশাসক এ. মমিন (ইপিসিএস)।

মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাবহুল শেষ কয়েক মাস :

মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ের কয়েকটি মাস বিশেষ করে ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে ডিসেম্বর মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত সময় ছিল ঘটনাবহুল এবং তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশ সরকার ১৯৭১’ নামে আমার প্রকাশিত গ্রন্থে উল্লিখিত তিন মাসের ঘটনাবহুল বিবরণ বিশদভাবে বিধৃত হয়েছে। সেই দিনগুলোর সব ঘটনা উল্লেখ না করে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের পটভূমি সংক্ষেপে তুলে ধরা প্রয়োজন।

সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম থেকেই ভারত এবং বাংলাদেশ সরকারের সর্বোচ্চপর্যায়ে আনুষ্ঠানিক আলাপ-আলোচনা শুরু হয়েছিল।

এ সময় ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত মি. দুর্গা প্রসাদ (ডি.পি.) ধর-এর সাথে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের সাথে দীর্ঘস্থায়ী বৈঠক হয়। বৈঠকে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়। বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি, মন্ত্রিসভা এবং প্রধান সেনাপতির সাথেও মিস্টার. ডি. পি. ধরের আলোচনা হয়। এই আলোচনার আগে মি. ধর ভারত-সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তি সম্পাদন করে এসেছিলেন।

 

২ মার্চ ১৯৭১ সর্বাত্মক হরতাল ঢাকায়

 

এই চুক্তির প্রভাব বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ওপর পড়েছিল। ভারতকে সোভিয়েত কর্তৃপক্ষ চুক্তির শর্তানুসারে বেশ বড় একটা সামরিক চালান সরবরাহ করে। এতে ভারতীয় সেনাবাহিনী অস্ত্রশস্ত্রে বলীয়ান হয়। ফলে ভারতের অস্ত্রভাণ্ডার থেকে ভারতের সমরাস্ত্রের অস্ত্রশস্ত্রের উল্লেখযোগ্য অংশ বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীর হাতে আসে। মুক্তিবাহিনী এসব অস্ত্রে সুসজ্জিত এবং সুসংগঠিত হয়।

এ সময় বাংলাদেশ সরকার সর্বদলীয়ভাবে ঐক্য পরিষদ গঠন করলে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ইতিবাচক দৃষ্টিতে গ্রহণ করে। এই ঐক্য প্রয়াস জাতীয় জনযুদ্ধকে নতুন মাত্রায় বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করে তোলে এবং সরকার মর্যাদাকর অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত হয়। মুক্তিযুদ্ধকালের সেপ্টেম্বর মাস যেমন তাৎপর্যমণ্ডিত ছিল তেমনি অক্টোবর মাসও ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ বাংলাদেশের বিজয়ের সূর্য এ মাসে আরো উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। অক্টোবর মাসেই ভারত ও বাংলাদেশের যৌথ কমান্ড সৃষ্টির চিন্তাভাবনা শুরু হয়। এ মাসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধী পশ্চিমা দেশগুলো সফরের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েন। ভারত-পাকিস্তান সংঘর্ষ বাধলে মার্কিন সরকার যাতে এ বিষয়ে না জড়িয়ে নিরপেক্ষ থাকে সে চেষ্টা তিনি করেছিলেন।

মিসেস গান্ধীর এই সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তানের কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধুকে মুক্ত করার লক্ষ্যে বিশ্বব্যাপী চাপ সৃষ্টি করা। অক্টোবর-নভেম্বর মাসে বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী চুক্তি সম্পাদনের সম্ভাবনা সম্পর্কে আলোচনা হয়। নভেম্বরেরমাঝামাঝি সময়ে নীতিনির্ধারণ ছাড়াও বিস্তারিত পরিকল্পনা গ্রহণের উদ্দেশ্যে ভারত ও বাংলাদেশের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তার মধ্যে আলাপ-আলোচনা হয়। এই পরিকল্পনার মূল ও মুখ্য বিষয় ছিল বিজ য় এবং বাংলাদেশকে শত্রুকবলমুক্ত করা।

ঐতিহাসিক ঘটনায় ভরপুর ছিল মুক্তিযুদ্ধকালের ডিসেম্বর মাস। এ মাসের ৪ তারিখে আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তান যুদ্ধ ঘোষণা করে। পাকিস্তানের মতলব বুঝে আগেই বাংলাদেশ ও ভারতীয় বাহিনীর সমন্বয়ে ‘মিত্র বাহিনী’ নামে যৌথ কমান্ড গঠিত হয়।

আরো যেসব উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে তার মধ্যে রয়েছে:

  • নিরাপত্তা পরিষদে যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবে রাশিয়ার ভেটো প্রদান।
  • ডিসেম্বরের ৬ তারিখে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারকে ভারতের পার্লামেন্টে স্বীকৃতি প্রদানের ঘোষণা।
  • মার্কিন সপ্তম নৌবহরের বঙ্গোপসাগরে প্রবেশের গুজব।
  • মিত্রবাহিনী কর্তৃক ঢাকার চতুর্দিক দিয়ে অবরুদ্ধ হানাদার বাহিনী প্রধান লে. জে. নিয়াজীর আত্মসমর্পণের তারবার্তা।
  • ১৬ ডিসেম্বর লে. জে. নিয়াজীর মিত্রবাহিনীর কাছে বিকেল ৪-৩০ মিনিটে রমনা রেসকোর্সে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে) আত্মসমর্পণ।
  • স্বাধীনতার সূর্যোদয়ে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের ভাষণ প্রদান।

আনন্দ-বিষাদে ভরা ১৬ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধু ২৬ মার্চ ঘোষিত স্বাধীন বাংলাদেশ শত্রুকবলমুক্ত হয়।

[ স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ]

রেফারেন্স :
১. দৈনিক সংবাদ : ২ মার্চ ২৯৭১
২. সিরাজউদ্দীন আহমেদ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (ভাস্কর প্রকাশনী, ঢাকা, ২০০১) পৃ ৩০৩
৩. হাসান হাফিজুর রহমান ও অন্যান্য সম্পাদিত, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র, হয় খo, প্রথম প্রকাশ (গণপ্রজাতন্ত্রী সরকার, তথ্য মন্ত্রণালয়, ১৯৮২) পৃ: ৮৬২
৪. প্রারুক্ত, ৬৬১

৫. দৈনিক সংবাদ, ২ মার্চ ১৯৭১
৬. প্রারুক্ত
৭. সিরাজউদ্দীন আহমেদ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, ভাস্কর প্রকাশনী, ঢাকা, ২০০১, পৃ: ৩০৯
৮. দৈনিক সংবাদ, মার্চ ১৯৭১
৯. দৈনিক সংবাদ, ১০ মার্চ ১৯৭১

১০ সিরাজউদ্দীন আহমেদ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তাম্বর প্রকাশনী, ঢাকা, ২০০১, ৩২২

১০ সিরাজউদ্দীন আহমেদ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, ভাস্কর প্রকাশনী, ঢাকা, ২০০১, পৃ: ৩১৯ ১১ দৈনিক সংবাদ, ১৫ মার্চ ১৯৭১

১৫ দৈনিক সংবাদ, ১৯ মার্চ ১৯৭১

১৬. দৈনিক সংবাদ, ১৬ মার্চ ১৯৭১

১৭ দৈনিক সংবাদ, ২১ মার্চ ১৯৭১ ক. ২১ মার্চ ১৯৭১

১৮. সিরাজউদদীন আহমেদ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, ভাস্কর প্রকাশনী, ঢাকা, ২০০১, ৩২২ O, 1:0:00

২০. দৈনিক পাকিস্তান, ২৪ মার্চ ১৯৭১ ২. দৈনিক সংবাদ, ২৫ মার্চ ১৯৭১

স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয়
“নিউইয়র্ক টাইমস’ সংবাদদাতা সিডনি শনবার্গ কৃত ডেট লাইন বাংলাদেশ নাইনটিন সেভেনটি ওয়ান, অনুবাস। মফিদুল হক, পু ১৭-১৮।

২৬. মন্ত্রিসভার সদস্যগণের মন্ত্রণালয় ব্যতীত সকল মন্ত্রণালয় দফতর।২৭. দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জেনারেল পদে উন্নীত করেছিলেন।২৮. দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্নেল (অব.) আবদুর রবকে জেনারেল পদে উন্নীত করেছিলেন।

আরও দেখুন:

“স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয়”-এ 10-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন