শান্তি কমিটি ১৯৭১ – মুনতাসির মামুন

শান্তি কমিটি ১৯৭১ – মুনতাসির মামুন [ ভূমিকা ]: ‘রাজাকার’, ‘দালাল’, যোগসাজশকারী বা ‘কোলাবরেটর’, ‘আল-বদর’, ‘আল শামস’ শব্দগুলির সঙ্গে ১৯৭১ সালের আগে বাঙালির কোনো পরিচয় ছিল না। দালাল শব্দটির সঙ্গে অবশ্য পরিচয় বাঙালির অনেক দিনের। তবে, ১৯৭১ সালে ‘দালাল’ বা ‘দালালি’ যে অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে সে অর্থে নয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়, মুক্তিযুদ্ধবিরোধী বিভিন্ন গ্রুপের গঠন, গ্রুপের সদস্যদের মন মানসিকতার ভিত্তিতে উদ্ভব হয়েছে শব্দগুলির।শান্তিকমিটি ১৯৭১ - মুনতাসির মামুন, শান্তি কমিটি ১

[ শান্তি কমিটি ১৯৭১ – মুনতাসির মামুন ]

১৯৭১ সালের পরিপ্রেক্ষিতে দালাল কে? ২৪ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে দালাল অধ্যাদেশ ‘বাংলাদেশ কোলাবরেটরস স্পেশাল ট্রাইব্যুনালস অর্ডার ১৯৭২’ জারি করা হয়। এতে দালাল বা যোগসাজশকারী বা কোলাবরেটরদের সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে:

১. পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে বাংলাদেশে বেআইনি দখল ঢিকিয়ে রাখার জন্য সাহায্য করা, সহযোগিতা বা সমর্থন করা ।

২. প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দখলদার পাকবাহিনীকে বস্তুগত সহযোগিতা প্রদান বা কোনো কথা, চুক্তি ও কার্যাবলীর মাধ্যমে হানাদার বাহিনীকে সাহায্য করা।

৩. গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা বা যুদ্ধের চেষ্টা করা। ৪. মুক্তিবাহিনীর তৎপরতার বিরুদ্ধে এবং মুক্তিকামী জনগণের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলা ।

৫. পাকবাহিনীর অনুকূলে কোনো বিবৃতি প্রদান বা প্রচারণায় অংশ নেয়া এবং পাকবাহিনীর কোনো প্রতিনিধি, দল বা কমিটির সদস্য হওয়া । হানাদারদের আয়োজিত উপনির্বাচনে অংশ নেয়া।”

উল্লিখিত সমস্ত গ্রুপই এর আওতায় পড়ে। সে অর্থে রাজাকার, কোলাবরেটর, আল-বদর বা পাকিস্তানপন্থী—সবাইকেই দালাল বলা হয়।

রাজাকার বাহিনী বা রাজাকারদের সংগঠন করেছিলো তৎকালীন পাকিস্তান সরকার । জেনারেল টিক্কা খান ১৯৭১ সালে জুন মাসে রাজাকার অধ্যাদেশ জারি করেছিলেন। পূর্বতন আনসার, মুজাহিদদের নিয়ে প্রাথমিকভাবে এ দল গঠিত হয় । কিন্তু পরে বিভিন্ন শ্রেণীর পাকিস্তানপন্থীরা এই বাহিনীতে যোগ দেয়। এরা ছিল সশস্ত্র হানাদার বাহিনীর দোসর হিসেবেই তারা মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে লড়েছে। জেনারেল নিয়াজী এক সাক্ষাৎকারে আমাকে বলেছিলেন যে, রাজাকার বাহিনীর তিনিই স্রষ্টা। তারা যথেষ্ঠ খেদমত করেছে পাকিস্তানি বাহিনীকে, যে কারণে তার বইটি তিনি তাদের উদ্দেশেই উৎসর্গ করেছেন।

আল-বদররা ছিল ডেথ স্কোয়াড। রাজাকার বাহিনীর পরপরই এটি গঠিত হয়। তবে, রাজাকার অধ্যাদেশের মতো কোনো আইনগত বিধান এর ভিত্তি নয় । কিন্তু, পাকিস্তানি বাহিনীর প্রেরণায় এরা সংগঠিত হয় এবং হানাদার বাহিনীর সঙ্গে এদের যোগাযোগ ছিল গভীর । আল-বদর বাহিনীকে অস্ত্রশস্ত্র ও অন্যান্য উপকরণ হানাদার বাহিনীই যুগিয়েছে। রাও ফরমান আলির নোটে আল-বদরদের উল্লেখ আছে । অবশ্য, সরকারিভাবে পাকিস্তানি বাহিনী তা অস্বীকার করেছে । আল-বদর বাহিনীর প্রধান ছিলেন বর্তমান জামায়াত ইসলামের নেতা মতিউর রহমান নিজামী। ৭ নভেম্বর ১৯৭১ সালে তারা ‘আল-বদর দিবস’ পালন করে। ১৪ নভেম্বর ১৯৭১ সালে নিজামী দৈনিক সংগ্রাম’-এ আলবদর বাহিনী সম্পর্কে। লেখেন

“… আমাদের পরম সৌভাগ্যই বলতে হবে। পাকসেনার সহযোগিতায় এদেশের ইসলাম প্রিয় তরুণ ছাত্র সমাজ বদর যুদ্ধের স্মৃতিকে সামনে রেখে আল বদর বাহিনী গঠন করেছে। বদর যুদ্ধে মুসলিম যোদ্ধাদের সংখ্যা ছিল তিন শত তের। এই স্মৃতিকে অবলম্বন করে তিন শত তের জন যুবকের সমন্বয়ে এক একটি ইউনিট গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বদর যোদ্ধাদের যেইসব গুণাবলীর কথা আমরা আলোচনা করেছি, আল-বদরের তরুণ মুজাহিদদের মধ্যে ইনশাআল্লাহ, সেই সর্বগুণাবলী আমরা দেখতে পাব।”

“পাকিস্তানের আদর্শ ও অস্তিত্ব রক্ষার দৃঢ় সংকল্প নিয়ে গঠিত আল-বদরের যুবকেরা এবারের বদর দিবসে নতুন করে শপথ নিয়েছে, তাদের তেজোদ্দীপ্ত কর্মীদের তৎপরতার ফলেই বদর দিবসের কর্মসূচী দেশবাসী তথা দুনিয়ার মুসলমানের সামনে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে। ইনশাআল্লাহ বদর যুদ্ধের বাস্তব স্মৃতিও তারা তুলে ধরতে সক্ষম। তরুণ যুবকেরা আমাদের সশস্ত্রবাহিনীর পাশাপাশি দাঁড়িয়ে হিন্দু বাহিনীকে পর্যদুস্ত করে হিন্দুস্তানকে খতম করে সারা বিশ্বে ইসলামের বিজয় পতাকা উড্ডীন করবে।”

 

শান্তি কমিটির আবেদন, ১৯৭১

রাজাকারদের সঙ্গে আল-বদরদের খানিকটা তফাত ছিল। রাজাকাররা সামগ্রিকভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের বিরোধিতা করেছে, সংঘর্ষ হলে খুন করেছে, লুটপাট ও ধর্ষণ করেছে। অনেকে যুদ্ধকালীন দুরবস্থার কারণে বাধ্য হয়েও রাজাকার হয়েছে, কিন্তু, আল-বদরদের লক্ষ্য ছিল স্থির। প্রকৃতিতে তারা ছিল অতীব হিংস্র ও নিষ্ঠুর। তারা বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের সম্পূর্ণভাবে নিকেশ করে দিতে চেয়েছে। কারণ, তারা অনুধাবন করেছিলো, যে ধরনের শাসন তারা করতে চায়, বুদ্ধিজীবীরা হয়ে উঠবে তার প্রধান প্রতিবন্ধক।

মুক্তিযুদ্ধ তো ছিল একটি আদর্শগত লড়াইও । বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ ছিল বাংলাদেশ তত্ত্বে বিশ্বাসী যা পরে প্রতিফলিত হয়েছিলো ১৯৭২ সালের সংবিধানে। দালালরা ছিল পাকিস্তান তত্ত্বে বিশ্বাসী। এই তত্ত্বে যারা বিশ্বাসী তাদেরও বিভিন্ন পর্যায় ছিল। রাজাকারদের মন-মানসিকতা বুঝতে হলে পাকিস্তান তত্ত্ব বা প্রত্যয় এবং এর বিভিন্ন পর্যায়ের খানিকটা ব্যাখ্যা দরকার। তা হলে বুঝতে পারব, কারা দালালি করেছে, কেন করেছে।

বাকি রইল আল-শামস। এরা আল-বদর ধরনেরই আরেকটি স্কোয়াড। হত্যাই ছিল যাদের মূল লক্ষ্য।

এ অঞ্চলের মানুষের মধ্যে একধরনের স্বাতন্ত্র্যবোধ কাজ করেছে সেই ষষ্ঠ শতক থেকেই। ১৯৪৭-এর আগে এই আঞ্চলিকতা-বোধ রূপান্তরিত হতে থাকে বাঙালি মুসলিম জাতীয়তাবাদে। এটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে, বাঙালি হলেও আগে মুসলমান হিসেবে বাংলাদেশের মানুষ পাকিস্তান চেয়েছিলো। গত শতকের শেষার্ধ থেকে বাংলাদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায় হিসেবে মুসলমানদের স্বাতন্ত্র্যবোধের সৃষ্টি হয়েছিলো। সম্প্রদায় হিসেবে সে ছিল অধস্তন। একজন বর্ণহিন্দু একজন শূদ্রের সঙ্গে যে ব্যবহার করে একজন মুসলমানের সঙ্গেও সে ব্যবহারে কোনো তারতম্য ছিল না।

আজিজুর রহমান মল্লিক ও সৈয়দ আনোয়ার হোসেন একটি প্রবন্ধে বিষয়টির আরো ব্যাখ্যা দিয়েছেন—“মুসলমানদের এই পৃথক পরিচয় দাবি বাহ্যত ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক প্রকৃতির বলে প্রতীয়মান হলেও মূলতঃ তা ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের আর্থ-রাজনৈতিক সমাজ-পরিবেশে একটি প্রান্তিকীকৃত (marginalised) অর্থাৎ ন্যায্য অধিকার বঞ্চিত সম্প্রদায়ের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম। এর ফলে, উপমহাদেশের সামাজিক-রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে জনসংখ্যার অবস্থানগত বাস্তবতা এখানকার হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়কে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড় করায়, যেখানে হিন্দুরা ছিল প্রায় সকল সুযোগ সুবিধার অধিকারী এবং মুসলমানরা ছিল ন্যায্য সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত।”

রাজাকারদের ধরে শাস্তি দিচ্ছে ভারতীয় বাহিনী
রাজাকারদের ধরে শাস্তি দিচ্ছে ভারতীয় বাহিনী

 

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর উঠতি বাঙালি মধ্যবিত্ত মুসলমান অর্থনৈতিক সুবিধা পেয়েছিলো । মুসলিম লীগ ছিল নেতৃত্বে। কিন্তু সমগ্র পাকিস্তান ভিত্তিতে বাঙালি মুসলিম লীগ নেতারা ছিল অধস্তন। অন্যদিকে, বাঙালি হিন্দুদের দেশত্যাগ বেশ একটা বড়সংখ্যক বাঙালি মুসলমানকে সুযোগ করে দিয়েছিলো সম্পদের ভিত্তি গড়ার। রাজনৈতিক যোগাযোগ ছিল যাদের সুবিধাটি তারাই পেয়েছিলো। এভাবে আদর্শের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলো কায়েমি স্বার্থ। তবে, পাকিস্তানি আদর্শকে সামনে রেখে অর্থাৎ ধর্মকে ব্যবহার করে ইসলামপন্থী’ বেশ কিছু দলের সৃষ্টি হয়, যেমন— জামায়াত ইসলাম, নেজামে ইসলাম প্রভৃতি। মুসলিম লীগের সঙ্গে এদের লড়াইটা ছিল আদর্শ থেকে ক্ষমতা করায়ত্তের।

এর বিরুদ্ধে সংস্কৃতির প্রশ্নেই দ্বন্দ্বটি প্রকট হয়ে ওঠে ১৯৪৭-এর পর থেকে, যার বিস্ফোরণ ঘটে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে। এর সঙ্গে যুক্ত হলো অর্থনীতি। মধ্যবিত্ত তো বটেই, সাধারণ বাঙালির প্রসারণের সুযোগই সংকুচিত হয়ে গেল । ফলে, সাংস্কৃতিক সত্তায় স্বাধীনতা ও প্রসারণের দাবিতে এগিয়ে এল পাকিস্তান কাঠামোর ভেতরেই অন্যান্য দল, যার মধ্যে কমিউনিস্ট পার্টি, আওয়ামী লীগ, ন্যাপ প্রধান ।

পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী সবসময় ইসলামকেই শোষণ ও কায়েমি স্বার্থ বজায় রাখার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছে। শাসকদের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ হলেই তা দেখা হতো ইসলামদ্রোহ হিসেবে। সমীকরণটি ছিল এরকম-ইসলামের বিরোধিতা মানে ভারতকে সমর্থন। ইসলামের প্রতীক পাকিস্তান, হিন্দুত্বের প্রতীক ভারত। পাকিস্তানি শাসকদের বিরোধিতা করার অর্থ হচ্ছে হিন্দুত্ব সমর্থন।

কেন্দ্রের অধস্তন বাঙালি সহযোগীরাও তা বিশ্বাস করত এবং প্রচার করত (যেমন মুসলিম লীগ, জামায়াত)। অধস্তন হলেও তারা তৃপ্তি পেত এই ভেবে যে, তারাও ক্ষমতার সহযোগী, কখনও কখনও অংশীদার এবং সে সুযোগে অর্থনৈতিক উপায়েরও সুবিধাভোগী । তবে, তাদের সবাই অর্থনৈতিক সুবিধার অংশীদার ছিল তা নয়, কিন্তু মনোজগতে যে আধিপত্য সৃষ্টি করেছিল দল তা ভাঙা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি।

প্রথম ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত কুষ্টিয়ার রাজাকার চিকন আলী
প্রথম ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত কুষ্টিয়ার রাজাকার চিকন আলী

 

১৯৫৮ সালে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখলের পর পাকিস্তান প্রত্যয়ে নতুন কিছু উপাদান যুক্ত হলো। ধর্ম ছাড়াও শাসনের উপাদান হিসেবে যুক্ত হলো আমলা, বিশেষ করে সামরিক আমলাতন্ত্রের আধিপত্য। এর অর্থ, আমলাতন্ত্র, বিশেষ করে সামরিক আমলাতন্ত্র কর্তৃক সিভিলসমাজ ও রাজনীতিবিদদের ওপর আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা, অভ্যন্তরীণ লুটের প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ (বিশেষ করে পাকিস্তানবিরোধী ) এ আদর্শ, আরো অনেক বাঙালিকে যুক্ত করতে পেরেছিল শাসকদের সঙ্গে।

এই সামগ্রিক বঞ্চনার আবেগ পাকিস্তানের পরিসরে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালির মনে সেই পুরনো আঞ্চলিকতার রেশ ফিরিয়ে আনে অর্থাৎ পূর্ববঙ্গ একটি একক যা বাংলাদেশ। শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় দফা বা স্বায়ত্তশাসনের রূপরেখা তারই প্রতিফলন। ছয় দফা প্রত্যাখ্যাত হলে সৃষ্টি করা হয় ‘পাকিস্তান’-এর বিপরীতে সোনার বাংলা মিথ। আঞ্চলিকতা-বোধ উত্তরিত হয় জাতীয়তাবাদে। সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি সোনার বাংলার স্বপ্ন মেনে নিতে থাকে। প্রশ্ন ওঠে সোনার বাংলা শ্মশান কেন? লিখেছেন বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর—

“এভাবে পুনর্নির্মিত, পুনর্গঠিত হয়েছে ইতিহাসের দিক থেকে মৌল এবং স্থায়ী এক প্রতিরোধ পাকিস্তান রাষ্ট্রের অন্তর্গত পূর্ব পাকিস্তান/বাংলাদেশের মধ্যে। সেনার বাংলার এই নির্মাণের ফলে পাকিস্তানের কেবল কথা বলার অধিকার আছে এবং পূর্ব বাংলা/পূর্ব পাকিস্তান/বাংলাদেশ কেবল নীরব, স্তব্ধ, মৌন, এই ধারণা যায় বদলে। এটি বদলে দেয় পরিস্থিতি এবং সাব অলটার্ন বাঙালিদের অভিজ্ঞতা, ইতিহাস, সংস্কৃতি, সমাজের বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যার মধ্যে স্পষ্ট হতে শুরু করে দ্বৈরথের সম্মুখীন হয়ে, নিশ্চিতভাবেই জাতীয়তাবাদী ইতিহাস তত্ত্বের ভিত্তিতে।”

শেখ মুজিবুর রহমান হয়ে ওঠেন বঙ্গবন্ধু। তাঁর নেতৃত্বে বাঙালি নতুন আদর্শ প্রতিষ্ঠার সংকল্প নেয়। মানসিকভাবে বাঙালি প্রস্তুত হয়ে ওঠে দ্বৈরথের জন্য। অন্যদিকে, ১৯৭০-এর নির্বাচনের আগে সংখ্যাগরিষ্ঠের মনোজগতে পরিবর্তন আসা শুরু করলেও পাকিস্তান আদর্শের ধ্বজাধারীরা তা গ্রাহ্যের মধ্যে আনেনি । কারণ, তাদের ধারণা ছিল মনোজগতে এবং কায়েমি স্বার্থ কেন্দ্রগুলিতে তাদের আধিপত্য কেউ ভাঙতে পারবে না, তা অটুট থাকবে।

রাজাকার গোলাম আজম

 

১৯৭০-এর নির্বাচনের পর পরিস্থিতি পাল্টে যায়। পাকিস্তান আদর্শের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে বাংলাদেশ আদর্শ। পাকিস্তান আদর্শ যারা অটুট রাখতে চেয়েছিল তারা গুরুত্ব দেয় পেশিশক্তির ওপর। পরিণামে শুরু হয় তাদের ভাষায় ‘গৃহযুদ্ধ‘। বাংলাদেশ আদর্শের পতাকাবাহীদের ভাষায় মুক্তিযুদ্ধ।

মুক্তিযুদ্ধ পাকিস্তান আদর্শবাদীদের জন্য বিপন্ন অবস্থার সৃষ্টি করে। এদের মধ্যে যাঁরা নিষ্ক্রিয় জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন তাঁরা মানসিক কষ্টের শিকার হলেও নিষ্ক্রিয়ই ছিলেন। তাঁরা মুক্তিযুদ্ধকে পাকিস্তান আদর্শের বিপর্যয় হিসেবেই দেখেছিলেন। কারণ, তাঁদের কাছে কখনও মনে হয়নি বাঙালি পরিচয়টি প্রথম, পাকিস্তানি পরিচয় আসে তার পরে।

রাজনীতির সঙ্গে যারা যুক্ত ছিল তারা ফিরতে চায়নি। কারণ, পাকিস্তান আদর্শ ও কেন্দ্রের সেনাবাহিনীর শক্তি তাদের কাছে ছিল অজেয়। তাদের মনে হয়েছিল, বাংলাদেশের আদর্শ জয়ী হলে তাদের স্থান হবে বিপন্ন। যে রাজনীতি করে তারা ক্ষমতার অংশীদার বা কায়েমি স্বার্থের অংশীদার হয়েছিলো সেটি থাকবে না। নতুন বাংলাদেশে তাদের স্থান থাকবে না।

এরচেয়ে পাকিস্তানে অধস্তন হিসেবে ক্ষমতার সহযোগী হওয়া ছিল শ্রেয়। এখানে আদর্শ বা ধর্মের প্রশ্ন আসতে পারে। কিন্তু সেটি গৌণ। সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি কি মুসলমান ছিল না? বা ইসলামে বিশ্বাস করত না? তবে, ধর্মটিকে ঢাল হিসেবে রাখা ছাড়া তাদের উপায় ছিল না। একটি উদাহরণ দিলেই তা স্পষ্ট হবে। তারা যা করেছে তা কি ইসলামি আদর্শে অনুমোদিত? ফলে, অস্তিত্বরক্ষার জন্য তারা নিজ নিজ অবস্থান থেকে যা করার করেছে।

খুলনার খান জাহান আলী সড়কে জামায়াত নেতা এ কে এম ইউসুফের নেতৃত্বে রাজাকারবাহিনীর শপথ
খুলনার খান জাহান আলী সড়কে জামায়াত নেতা এ কে এম ইউসুফের নেতৃত্বে রাজাকারবাহিনীর শপথ

 

ড. সাজ্জাদ হোসায়েনের পক্ষে সম্ভব ছিল না, সাধারণ আল বদরের মতো অস্ত্রহাতে ঘোরা। কিন্তু লক্ষ্য ছিল এক। ফলে, যার যার অবস্থান থেকে সে সে কাজ করে গেছে। এভাবে সৃষ্টি হয়েছে পাকিস্তানি দালালদের, দালালদের মধ্যে অবস্থাগত কারণে আবার বিভিন্ন গ্রুপের। এর মধ্যে সবচেয়ে হিংস্র ও ফ্যাসিস্ট হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে জামায়াত ইসলাম ও তার অঙ্গ সংগঠন ছাত্রসংঘ। পাকিস্তানের অ্যাকাডেমিশিয়ান আব্বাস রশীদ ‘পাকিস্তান : মতাদর্শের পরিধি’ শীর্ষক প্রবন্ধে এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছেন—

“উলেমাগোষ্ঠীর নিকট আইউব খানের নির্ভরশীলতার মধ্য দিয়ে সামরিক বাহিনী এবং সনাতনপন্থী সংগঠনের মাঝে অসম হলেও পারস্পরিক ফলপ্রসূ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তবে, সনাতনপন্থীদের প্রতিনিধি হিসেবে অগঠিত, অসংঘবদ্ধ উলেমাগোষ্ঠী নয় বরং তাদের স্থান ইতিমধ্যে দখল করে নেয় সুসংগঠিত জামাত-ই ইসলামী । জামাত-ই ইসলামীর নেতৃত্ব পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর ধ্বংসযজ্ঞকে কেবল সমর্থনই করেনি, তাদের কর্মী ও সদস্যরা শান্তি কমিটিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ করে।

সামরিক বাহিনী কর্তৃক সৃষ্ট এই শান্তিবাহিনীর দায়িত্ব ছিল বিদ্রোহ দমনে সামরিক কর্মকর্তাদের সহায়তা করা। আদর্শগত পর্যায়েও জামাত-ই ইসলামীর সমর্থন দুশ্চিন্তাগ্রস্থ সামরিক বাহিনী স্বাগত জানিয়েছিল সর্বান্তঃকরণে।” তাই আমরা দেখি, আল-বদর ও আল-শামসদের মধ্যে জামায়াতের কর্মীই বেশি।

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপরই দালালদের দ্বারা গঠিত হয় শান্তি কমিটি। ২৬ এপ্রিল, ১৯৭১ সালের ‘দৈনিক পাকিস্তানে’র সংবাদ অনুসারে:

“স্বাভাবিক জীবনযাত্রা দ্রুত পুনঃপ্রতিষ্ঠা, রাষ্ট্রবিরোধী ও সমাজবিরোধী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে জনগণকে সজাগ রাখা ও গুজব রচনাকারীদের দুরভিসন্ধি প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে এই কমিটি গঠিত হয়েছে।”

এর সদস্যরা ছিল পাকিস্তান আদর্শের অনুসারী বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, এলিট, যারা অস্ত্রহাতে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধ করতে যায়নি। অন্যান্যের তুলনায় শান্তি কমিটির সদস্যরা ছিল বলা যেতে পারে ‘নরমপন্থী’। কিন্তু হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনায় বা অংশগ্রহণে তারা নিষ্ক্রিয় ছিল না। অনেক ক্ষেত্রে।

বিভিন্ন পেশায় বা পদে থেকে এবং রাজনীতিবিদ হিসেবে যারা হানাদারদের সহযোগিতা করেছে সেই সময়, তাদের চিহ্নিত করা হয়েছে ‘কোলাবরেটর’ হিসেবে। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক অনেকেই ছিলেন।

এরপর ছিল রাজাকার। আসলে এর শুদ্ধ উচ্চারণ ‘রেজাকার’-ফারসি শব্দ। ‘রেজা’ হল স্বেচ্ছাসেবী, ‘কার’ অর্থ কর্মী। এক কথায় স্বেচ্ছাসেবী। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের সময় হায়দরাবাদের নিজাম অনিচ্ছুক ছিলেন ভারতের সঙ্গে মিলনে। আত্মরক্ষার জন্য তিনি গঠন করেছিলেন একটি স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী যার নাম দেয়া হয়েছলো রেজাকার বাহিনী।

মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াত নেতা এ. কে. এম. ইউসুফ শব্দটি ধার করেন এবং খুলনায় রেজাকার বাহিনীর সূত্রপাত করেন। একাত্তরের ঘাতক ও দালালরা কে কোথায়’ গ্রন্থের তথ্য অনুযায়ী, ৯৬ জন জামায়াত কর্মী নিয়ে এই বাহিনীর সূত্রপাত যা পরে পুরো বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। পূর্বোক্ত গ্রন্থ অনুযায়ী—“প্রশাসনিকভাবে এই বাহিনীতে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর লোক অন্তর্ভুক্ত হলেও তাদেরকে তিনভাগে ভাগ করা যেতে পারে।

প্রথমতঃ যারা ‘পাকিস্তান’ ও ইসলামকে রক্ষার জন্য বাঙালি হত্যা ও মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে যুদ্ধ করাকে কর্তব্য মনে করেছিল,

দ্বিতীয়তঃ যারা লুটপাট, প্রতিশোধ গ্রহণ, নারী নির্যাতন করার একটি সুযোগ গ্রহণ করতে চেয়েছিল

এবং তৃতীয়তঃ গ্রামের দরিদ্র অশিক্ষিত জনগণ যারা সীমান্তের ওপারে চলে যেতে ব্যর্থ হয়—এ ধরনের লোককে প্রলুব্ধকরণ, বল প্রয়োগ বা ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে রাজাকার বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।”

রাজাকার বাহিনী যাদের নিয়েই গঠিত হোক না কেন, এই বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ করত জামায়াতে ইসলামী। আবু সাইয়িদ তাঁর ‘সাধারণ ঘোষণার প্রেক্ষিত ও গোলাম আজম’ গ্রন্থে জনৈক রাজাকারের পরিচয়পত্র তুলে দিয়েছেন যেখানে তার প্রমাণ পাওয়া যাবে

“This is to certify that Mr. Haroon-ur-Rashid Khan, S/o. Abdul Azim Khan, 36, Purana Paltan Lane, Dacca-2 is our active worker. He is true Pakistani and dependable. He is trained Razakar. He has been issued a Rifle No-776 … with ten round ammunition for self-protection.

Sd/ – illegible

IN CHARGE RAZAZKAR AND MUZAHID JAMAT-E-ISLAM 91/92, Siddique Bazar, Dacca.”

রাজাকারদের বিভিন্ন স্থাপনা পাহারা দেয়া, মুক্তিবাহিনীর খোঁজ করা প্রভৃতি কাজে ব্যবহার করা হতো। বাংলাদেশের গ্রামেগঞ্জে এরাই ছড়িয়ে পড়েছিল। সে কারণে, বাঙালিদের কাছে রাজাকার শব্দটি বেশি পরিচিত হয়ে ওঠে

আবু সাইয়িদ জানাচ্ছেন, আল-বদর বাহিনীর গঠনের সূত্রপাত জামালপুর শহরে । পাকিস্তান বাহিনী ২২ এপ্রিল জামালপুর দখল করে নিলে, জামালপুরের ইসলামী ছাত্রসংঘের সভাপতি মুহাম্মদ আশরাফ হোসেনের নেতৃত্বে আল-বদর বাহিনী গঠিত হয়।

“জামালপুর মহকুমায় আল-বদর বাহিনী কর্তৃক ৬ জন মুক্তিবাহিনীকে হত্যার মাধ্যমে তাদের ‘কৃতিত্ব’ প্রকাশিত হয়ে পড়লে জামায়াত ইসলামী নেতৃত্ব অনুধাবন করতে সক্ষম হয় যে, রাজাকারদের চেয়ে উন্নততর মেধাসম্পন্ন রাজনৈতিক সশস্ত্র ক্যাডার গড়ে তোলার সুযোগ বর্তমান।

আগস্ট মাস হতেই সারাদেশে ইসলামী ছাত্রসংঘকে আল-বদরে রূপান্তরিত করা হয় এবং নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে ও ডিসেম্বরের প্রথম পক্ষে তাদের বুদ্ধিজীবী হত্যার তালিকা দিয়ে অপহরণ, নির্যাতন ও হত্যার জন্য পাঠান হয়। তাদের মধ্যে ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি করে ইসলাম ও পাকিস্তান রক্ষার নামে বুদ্ধিজীবী হত্যায় নামান হয়।

২৫ নভেম্বর ঢাকা শহর ইসলামী ছাত্রসংঘের কার্যকরী পরিষদ পুনর্গঠিত হয়। জানাচ্ছেন সাইয়িদ, “এই পরিষদে বুদ্ধিজীবী হত্যাযজ্ঞের ‘চীফ একসিকিউটর’ ( প্রধান জল্লাদ) আফরাফুজ্জামান সহ বুদ্ধিজীবী হত্যাকারী খুনী আল-বদর কমান্ডাররা অন্তর্ভুক্ত হয়। বর্তমানে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মসলিশের শুরার সদস্য সামসুল হকের সভাপতিত্বে গঠিত এই কমটির সদস্যরা ছিল:

১. মোস্তফা শওকত ইমরান।
২. নূর মোহাম্মদ মল্লিক।
৩. এ. কে. মোহাম্মদ আলী।
৪. আবু মোঃ জাহাঙ্গীর।
৫. আশরাফুজ্জামান।
৬. আ.শ.ম. রুহুল কুদ্দুস।
৭. সর্দার আবদুস সালাম।”

আল-বদরদের কার্যকলাপ সুবিদিত। এ বিষয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। এভাবে বাংলাদেশ আদর্শের বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, তাদের সৃষ্ট বিভিন্ন গ্রুপের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে কাজ শুরু করে ।

১৯৭১ সালে তো বটেই, তারপর তিন দশক পর্যন্ত, এদেশে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি কীভাবে কাজ করে বা মনোজগতে আধিপত্য বিস্তার করে যাচ্ছে সে ব্যাপারে গভীরভাবে কেউ চিন্তা করেছেন বলে জানি না।

আগেই উল্লেখ করেছি মুক্তিযুদ্ধের বা বাংলাদেশের স্বাধীনতার বা স্বায়ত্বশাসনেরও বিরোধিতা করেছেন অনেকে ১৯৭১ সালের আগে। ঐ বিরোধিতা, যুক্তির খাতিরে অগ্রহণযোগ্য এমন বলা যাবে না। কিন্তু, ১৯৭১ সালের মার্চ থেকে ডিসেম্বর এবং স্বাধীনতার পর এ যুক্তি কোনোক্রমেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। সংবিধানের প্রথম পাতাতেই লেখা আছে:

আমরা, বাংলাদেশের জনগণ, ১৯৭১ খৃস্টাব্দের মার্চ মাসের ২৬ তারিখে। স্বাধীনতা ঘোষণা করিয়া জাতীয় স্বাধীনতার জন্য ঐতিহাসিক যুদ্ধের (সংশোধিত পাঠ) মাধ্যমে স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত করিয়াছি।

এরপর স্বাধীনতাসংক্রান্ত কোনো বিষয় আদালতের এখতিয়ারে পর্যন্ত আসতে পারে না। কিন্তু, বাংলাদেশ যেহেতু পৃথিবীর একমাত্র সব সম্ভবের দেশ সেহেতু এখানে এর উল্টোটাই ঘটেছে। পৃথিবীতে একমাত্র বাংলাদেশেই স্বাধীনতাপক্ষের ও বিপক্ষের শক্তি আছে।

এ প্রশ্ন অবশ্যই অনেকে করতে পারেন যে, স্বাধীনতালাভের পর একটি দেশে আবার স্বাধীনতার বিপক্ষের শক্তি হয় কীভাবে? পৃথিবীতে, এদেশেই একমাত্র সরকার ও বিরোধীদল একই সঙ্গে স্বাধীনতার বিপক্ষের শক্তির সঙ্গে নমনীয় ব্যবহার করে। পৃথিবীতে একমাত্র বাংলাদেশেই স্বাধীনতার বিপক্ষের পত্রিকাসমূহ অবাধে প্রকাশিত হয় এবং স্বাধীনতার বিপক্ষীয়রা স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ক্রমাগত বিষোদ্গার করে যেতে পারছে। আলোচিত গ্রন্থসমূহ এর একটি উদাহরণ মাত্র।

শুধু তাই নয়, প্রাক্-মুক্তিযুদ্ধ পর্বের পাকিস্তান প্রত্যয়ের বিভিন্ন উপাদান আবার যুক্ত হচ্ছে রাজনীতিতে। বাংলাদেশ আদর্শের বিপরীতে সে বিষয়গুলি তুলে ধরা হচ্ছে, যা দেশের ভবিষ্যতের জন্য ভয়ংকর। এই আদর্শের নাম দেয়া যেতে পারে পাক-বাংলা আদর্শ। এ আদর্শের যারা ধারক তাদের বাংলাদেশের অস্তিত্ব মেনে নিতে হচ্ছে। কিন্তু, বাংলাদেশ আদর্শ তাদের পক্ষে মেনে নেয়া সম্ভব হচ্ছে না হীনম্মন্যতার কারণে।

কুখ্যাত রাজাকার সাইদি
কুখ্যাত রাজাকার সাইদি

 

কায়েমি স্বার্থ যা সৃষ্টি হয়েছে গত ত্রিশ বছরে তা বজায় রাখতে গেলেও পাক-বাংলা আদর্শ ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। এর প্রধান উপাদান পাকিস্তানে বিশ্বাস, ভারতকে ইহজগতের প্রধান শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা কিন্তু ভারতকে গোপনে সুযোগ দেয়া, ইসলাম ধর্মকে ক্ষমতা দখলের স্বার্থে ব্যবহার করা, সামরিক আধিপত্যে বিশ্বাস ইত্যাদি। এই আদর্শের স্রষ্টা ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত শত্রুরা।

এদের পুনর্বাসিত করে জিয়াউর রহমান এই আদর্শের প্রবক্তা হয়ে ওঠেন, পরে হুসাইন মুহাম্মদ এরশাদ তাঁকে অনুসরণ করেন। এঁরা এসব উপাদানের সঙ্গে যুক্ত করেন কাকুল কালচার। কাকুলে যৌবনে তাঁরা প্রশিক্ষিত হয়েছিলেন এবং তা মগজে গেঁথে গিয়েছিলো। সেটিরও আবার ক্লোন তৈরিতে তাঁরা সমর্থ হয়েছেন। পাকিস্তান আদর্শের স্রষ্টাদের অনেকের মৃত্যু হলেও তাদের দলে নতুন ক্লোন সৃষ্টি করা হয়েছে। এই ক্লোনরা যে সবাই সে আদর্শে বিশ্বাসী তা নয়। তারা বিশ্বাসী কায়েমি স্বার্থ বজায় রাখা, স্বার্থের নতুন মানচিত্র তৈরি করায়।

এ প্রসঙ্গে পাকিস্তানি অ্যাকাডেমিশিয়ান পারভেজ আলী হুদোভয় ও আবদুল হামিদ নায়ার ‘পাকিস্তানের ইতিহাস পুনর্লিখন’ প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন—”দেশ বিভাগের ৩০ বছর পর পরিকল্পিতভাবে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের পুনর্জাগরণে এটাই প্রমাণ করে যে ধর্মীয় কোনো মহৎ উদ্দেশ্য নয়, রাজনৈতিক মতলববাজিই এখানে বৃহত্তর ভূমিকা পালন করেছে।

সমাজের চিরস্থায়ী সামরিকীকরণের জন্য চাই একজন চিরস্থায়ী শত্রু। অনেক কারণেই পাকিস্তানের অন্যান্য প্রতিবেশীরা এই কাজের জন্য উপযুক্ত নয়। অপরদিকে ভারত ও পাকিস্তানের শাসকবর্গ এই পারস্পরিক শত্রুতা ও উত্তেজনাকে একটি অপরিহার্য রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে দেখে আসছে।”

এখানে সৃষ্ট পাকি ক্লোনরা ঠিক একই কাজ করছে কি না সচেতন নাগরিক মাত্রই তা বিচার করতে পারবেন। গত বিশ বছরে এদেশে সৃষ্ট নতুন রাজনৈতিক দলগুলির নেতাদের বক্তৃতা-বিবৃতিই এর প্রমাণ।

কামরুল হাসানের আঁকা ইয়াহিয়া
কামরুল হাসানের আঁকা ইয়াহিয়া

 

এসব বিষয় নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা হলে হয়তো কিছু জানা যেত। কিন্তু হয়নি এবং তথ্যের স্বল্পতাও লক্ষণীয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় তাদের কার্যকলাপের বিবরণ সংগ্রহ করা এখন প্রায় দুঃসাধ্য হয়ে উঠেছে। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীরাই এগুলি নষ্ট করে ফেলেছে বা ফেলছে। মুক্তিযুদ্ধের ত্রিশ বছর পর, এ. এস. এম. শামসুল আরেফিন ‘রাজাকার ও দালাল অভিযোগে গ্রেফতারকৃতদের তালিকা’ প্রণয়ন করেছেন যার কয়েকটি খণ্ড মাত্র প্রকাশিত হয়েছে।

প্রশ্ন উঠতে পারে যাদের আমরা স্বাধীনতা বিরোধী বা রাজাকার বলি তাদের কেউ ছিল কোলাবরেটর, কেউ আল-বদর বা অন্যকিছু। কিন্তু আগেই বলেছি কাগজপত্রে বিভিন্ন বিভাগ থাকলেও মূলত এরা সব একই লক্ষ্যের অনুসারী। এই বিভাজন বিভ্রান্তিরও সৃষ্টি করতে পারে মাঝে মাঝে। আরেফিন নিজেও এ সমস্যায় পড়েছিলেন তাঁর উপর্যুক্ত গ্রন্থ লিখতে গিয়ে। লিখেছেন তিনি—

“বিভিন্ন পরিচয়ে এদের ভাগে ভাগে না দেখিয়ে গড়পরতা সবাইকে ‘দালাল’ পরিচয়ে চিহ্নিত করার প্রয়াসের পেছনে একটা কারণও রয়েছে। সবচেয়ে বড় কারণ যেটি তা হল, যে সব সরকারী কাগজের আলোকে এই তালিকাটি প্রস্তুত হয়েছে সেই সবের ছক অভিন্ন ছিল না। কোথাও গ্রেফতারকৃত ব্যক্তির অপরাধের কারণ সংক্ষেপে বলা হয়েছে, কোথাও শুধু বলা হয়েছে কোলাবরেটর অথবা দালাল অথবা পাকিস্তান বাহিনীর সহযোগী।

কোন কোন তালিকায় তাদের পরিচয় এরূপও রয়েছে যে, “Arrested Razakars, All Badars and Mujahids” অথবা, “Arrested on as they were either members of Razakars, Al-Badars, Al-Shams or Mujahid organisation and also supported the Pak Army in killing innocent public, looting, arson etc.”

এ পরিপ্রেক্ষিতে এক কথায়, মোটাদাগে স্বাধীনতাবিরোধীদের আমি ‘রাজাকার’ নামে অভিহিত করেছি। রাজাকার, আগেই উল্লেখ করেছি, যারা বাংলাদেশে ছিল এবং মানুষ এই নাম ও তাদের কার্যকলাপের সঙ্গে পরিচিত। জাহানারা ইমামের ‘ঘাতক দালাল নির্মূল’ আন্দোলন শুরু হলে রাজাকার নামটি আরো পরিচিত হয়ে সাধারণের ভাষ্যে চলে আসে। হুমায়ূন আহমেদের একটি নাটকের সংলাপ ছিল—’তুই রাজাকার’।

রাজাকার [ Rajakar ]
রাজাকার [ Rajakar ]
এসব কারণে, স্বাধীনতাবিরোধী ব্যক্তি সে আল-বদরই হোক বা দালালই হোক পরিচিত হয়ে ওঠে রাজাকার হিসেবে। জামায়াত ইসলাম, বাংলাদেশের আমীর গোলাম আযম অবশ্য সম্প্রতি বলেছেন, তাঁরা ‘রাজাকার’ ছিলেন না, ছিলেন ‘রেজাকার’। হতে পারে রেজাকার শুদ্ধ, কিন্তু মানুষের কাছে অশুদ্ধ রাজাকারই পরিচিত। তাই আমিও রেজাকার-কে রাজাকারই লিখলাম ।

রাজাকার, আলবদর বা দালালদের নিয়ে যে বিস্তারিত আলোচনা আগে হয়নি তা নয়, হয়েছে, তবে শান্তিকমিটি নিয়ে আলোচনা একেবারেই হয়নি। কারণ, সমাজের একটি বড় অংশের ধারণা, এবং বিষয়টি নিয়ে আলোচনা না হওয়ায়, সেই ধারণা আরো বদ্ধমূল হয়েছে যে, শান্তিকমিটি অশান্তির কিছু করেনি।

হানাদার বাহিনীর সহযোগী অনেক কিছু সৃষ্টি করা হয়েছিল, শান্তিকমিটি তার মধ্যে একটি। হ্যা, তারা হানাদার বাহিনী সৃষ্ট বটে কিন্তু তারা মানুষজনের তেমন ক্ষতি করেনি। শুধু তাই নয়, অনেকে বাধ্য হয়েও শাস্তিকমিটি করেছে। শুধু তাই নয় মুক্তিযোদ্ধাদেরও সহায়তা করেছে।

এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। হানাদারদের সহযোগী হিসেবে আলবদর, রাজাকাররা যা করেছে শান্তিকমিটির সদস্যরাও অনেক ক্ষেত্রে তাই করেছে। অনেকে হয় নিষ্ক্রিয় ছিল কিন্তু মতাদর্শগতভাবে তারা বাঙালিদের বিরুদ্ধে ছিল। হ্যা, কেউ কেউ বাধ্য হয়ে শান্তিকমিটিতে যোগ দিয়েছেন, দু’একজনকে হয়ত রক্ষাও করেছেন কিন্তু সে সংখ্যা নগন্য।

শান্তিকমিটির সদস্যরা রাজাকারদের সঙ্গে মিলে হানাদারদের চেনা অচেনা লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছে দিয়েছে। হত্যা, লুট করেছে। বিশেষ করে শান্তিকমিটির অবাঙালি সদস্যরা হানাদার পাকিস্তানি সৈন্যদের মতো আচরণ করেছে।

হানাদার বাহিনীর অন্যান্য সহযোগী গ্রুপগুলির মধ্যে শাস্তিকমিটিতেও যারা যোগ দিয়েছিলেন আদর্শগতভাবে তারা পাকিস্তান প্রত্যয়ে বিশ্বাসী ছিলেন। এই পাকিস্তান প্রত্যয়ে বিশ্বাসের অর্থ, হানাদারদের সহায়তা করে, ভারতকে প্রধান শত্রু এবং হিন্দুদের জাতীয় ঐক্যের প্রতি ক্ষতিকর মনে করা।

ওয়ামী লীগ বা ধারার অনুসারীরাও ভারতের দালাল ও হিন্দুদের সহযোগী। শান্তিকমিটির প্রতিটি সভায়ই এ বিষয়গুলিই উচ্চারিত হয়েছে। সুতরাং পাকিস্তান রক্ষার জন্য প্রয়োজন আওয়ামী লীগ/হিন্দু/বামপন্থীদের নিকেশ করা। তাদের সহায়সম্পত্তি ‘গনিমতের মাল’ হিসেবে বিবেচনা করা ও হানাদারদের সর্বাত্মক সহযোগিতা করা।

যেসব দলের সমর্থকরা রাজাকার বা আলবদর হয়েছিল সেসব দলের সমর্থকরাই শান্তিকমিটিসমূহ গঠন করেছিলেন। অর্থাৎ মুসলিম লিগ, জামায়াত, পিডিপি প্রভৃতি। কেন্দ্রীয় শান্তিকমিটির যারা নেতা বা নীতি নির্ধারক ছিলেন তারা ছিলেন এসব দলের প্রধান।

যেমন, খাজা খয়েরউদ্দিন ছিলেন মুসলিম লিগের, গোলাম আজম জামায়াতে ইসলামের, ফরিদ আহমদ পিডিপির প্রভৃতি। শান্তি কমিটি ছিল বাঙালিদের দমনে হানাদার বাহিনীর আরেকটি ফ্রন্ট। আরো উল্লেখ্য, যাদের আমরা মনে করি বাঙালি বিরোধী চক্রের নীতি প্রধান বা যুদ্ধাপরাধী তাদের অনেকে কিন্তু জড়িত ছিলেন শান্তিকমিটির সঙ্গেই।

বাঙালি বিরোধীদের নিয়ে গবেষণা করতে গেলে প্রথমেই যে বিষয়টির সম্মুখীন হতে হয় তাহলো তথ্যের নিতান্ত অভাব। রাজাকাররা পরাজিত হওয়ার পরপরই তাদের অপকর্ম ঢাকতে চেয়েছে। প্রমাণাদি নষ্ট করেছে। জিয়াউর রহমান, হোসাইন মোহাম্মদ এরশাদ ও খালেদা জিয়া তাদের পুনর্বাসন করা শুধু নয়, ক্ষমতার অংশীদার করার কারণেও তাদের পক্ষে সম্ভব হয়েছে তাদের সমস্ত অপকর্ম চাপা দেয়ার। সে কারণেই তাদের সম্পর্কে গবেষণা কম। আমাকেও একই সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে। তবুও যা পেয়েছি তা দিয়েই বইয়ের নির্মাণ কাজ শুরু করেছি।

বইটি কয়েকটি পর্বে বিভক্ত। প্রথম পর্বে শান্তিকমিটির প্রতিষ্ঠা ও বিকাশ, দ্বিতীয় পর্বে, তাদের কর্মকাণ্ডের বিস্তারিত বিবরণ; অবশ্য দু’টি পর্ব একেবারে আলাদা করে বিচার করা যাবে না। তৃতীয় পর্বে শান্তিকমিটির কয়েকজন যারা অত্মজীবনী লিখেছেন তাদের নিয়ে কেস স্টাডি। চতুর্থ পর্বে কমিটির সদস্য যাদের সম্পর্কে কিঞ্চিৎ তথ্য পাওয়া গেছে তাদের বিবরণ ও তালিকা।

পঞ্চম পর্বে শান্তিকমিটির তালিকা। ষষ্ঠ পর্বে শান্তিকমিটি সংক্রান্ত প্রকাশিত খবরাখবর। গত তিন দশকে বিভিন্ন সময় সমসাময়িক সংবাদপত্র থেকে নোট নিয়েছিলাম। এখন সে সব পত্রিকা পাওয়া যায় না। নোটও অনেক হারিয়ে গেছে। তবে এর পরিপূরক হিসেবে সম্প্রতি দু’টি বই থেকে পর্যাপ্ত সাহায্য নিয়েছি। বই দু’টি হলো-ইফতেখার আমিনের একাত্তরের দালালনামা ও আলী আকবর টাবীর দৈনিক সংগ্রাম মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী ভূমিকা। সপ্তম পর্বে গ্রন্থে উল্লিখিত শান্তিকমিটির সদস্যদের একটি তালিকা ।

আরও দেখুন…

“শান্তি কমিটি ১৯৭১ – মুনতাসির মামুন”-এ 4-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন