রোজার ইতিহাস

রোজার ইতিহাস : রোজার ইতিহাস বা শুরু মানবজাতির সূচনালগ্নের সাথে জড়িত। ইসলাম ধর্মের বর্ণনামতে হযরত আদম আঃ থেকেই রোজা পালন হয়ে আসছে বলে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়। ফাতহুল বারী কিতাবের চতুর্থ খন্ডে রোজার ইতিহাস সম্পর্কে লিখিত পাওয়া যায় যে, হযরত আদম আঃ বেহেশতে থাকাকালীন সময়ে গন্ধম নামের নিষিদ্ধ ফল খেয়ে ফেলার পর মহান আল্লাহ তাআলার কাছে তওবা (ক্ষমা প্রার্থনা) করেন। কিন্তু তার তওবা প্রথমেই কবুল হয় নাই। তিরিশ দিন পর তওবা কবুল হয়। তখন আদম সন্তানের উপর তিরিশটি রোজা রাখা ফরজ করে দেওয়া হয়। 

রোজার ইতিহাস

পবিত্র কুরআন আল কারীমে সূরা বাকারার ১০৩ নং আয়াতে রোজার ব্যাপারে ঘোষণা এসেছে,

হে ইমানদার লোকেরা, তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতের উপর। যাতে করে তোমরা তাকওয়া (আল্লাহ ভীতি) অর্জন করতে পারো।” 

রোজার ইতিহাস সম্পর্কে এই আয়াতে এটা স্পষ্ট যে, রোজা কেবল হযরত মুহাম্মদ সাঃ এর উম্মতের উপর ফরজ বা আবশ্যক ইবাদত নয়। এটি মানব ইতিহাসের সূচনা থেকেই সকল নবী রাসূলগণ ও তার উম্মতদের উপর ফরজ ছিল। হাদীস সমূহের কিতাবের মাঝে সবচেয়ে বিশুদ্ধ কিতাব বুখারী শরীফে বর্ণনা করা হয়েছে, আল্লাহর নবী হযরত দাউদ আঃ একদিন পরপর রোজা থাকতেন। হাদীসে বলা হয়েছে, আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় রোজা হযরত দাউদ আঃ এর রোজা।

[ রোজার ইতিহাস ]

হযরত নূহ আঃ শাওয়াল মাসের প্রথম দিন ও জিলহজ মাসের ১০ তারিখ ছাড়া বাকি সারা বছর রোজা রাখতেন বলে ইবনে মাজাহ শরীফের একটি বর্ণনা পাওয়া যায়। বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, নবী মুহাম্মদ সাঃ এর যুগে ইসলাম ধর্ম শুরু হওয়ার আগেও আরবরা রোজা রাখত। মক্কার কুরাইশরা মুহাররম মাসের ১০ তারিখ আশুরা পালন করতো এবং এদিন তারা কাবা ঘরের উপর নতুন গিলাফ পড়াতো। আশুরার দিন কুরাইশরা রোজা রাখত বলে বুখারী এবং মুসনাদ ইবনে হাম্বলের বর্ণনা পাওয়া যায়। আবার ইহুদিরা তৎকালীন সময়ে নিজেদের মাস গণনার পদ্ধতি অনুসারে তাদের সপ্তম মাসের দশম দিন রোজা পালন করতো। 

রোজা শব্দটি কিন্তু আরবি কোন শব্দ নয়। বাংলায় এটি একটি আগত বিদেশি শব্দ হিসেবে এসে পারিভাষিক শব্দ হয়ে আমাদের ভাষার নিজস্ব শব্দই হয়ে গেছে বলা যায়। রোজা শব্দটি এসেছে আদি ইরানীয় ধাতুমূল রোওচাকাহ থেকে যার অর্থ উপবাস এবং ইন্দো-ইরানী ধাতুমূল রোচস থেকে, যার অর্থ দিনের আলো। রোজা একটি ফারসি শব্দ। আরবিতে রোজা বা সংযমকে বলা হয় সাওম। সাওম বা সিয়াম ইসলাম ধর্মের পাঁচটি মূল ভিত্তির তৃতীয় ভিত্তি। উম্মতে মুহাম্মদীর প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের উপর রোজা ফরজ বা আবশ্যক করা হয়েছে।

History of Fasting in Ramadan 3 রোজার ইতিহাস

সুবহে সাদিক বা ভোরের প্রথম আভা থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত একজন মুসলিম সকল ধরণের আহার, পানাহার, কামাচার, পাপাচার এবং যাবতীয় ভোগ বিলাস থেকে বিরত থাকবে এবং এটি হবে একমাত্র মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। এই ইবাদতটিই সাউম বা রোজা। মুসলিমগণ আরবি রমজান মাসের ২৯ বা ৩০ দিনেই প্রতিদিন ফরজ রোজা রাখেন। রমজানের চাঁদ দেখা গেলে এ মাসের গণনা শুরু হয় এবং ইদের চাঁদ দেখা যাওয়া পর্যন্ত তা চলমান থাকে। রমজানের একমাস রোজা পালনের পর মুসলিমরা ইদুল ফিতর উৎসব পালন করেন। 

রোজার ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, কেবল ফরজ রোজা নয়, ইসলামে আরো অনেক ধরণের রোজা রয়েছে। যেমন, সুন্নত রোজা। মুহররম মাসের ৯,১০ ও ১১ এই তিন তারিখের মধ্যে যে কোন দুইদিন রোজা রাখা সুন্নত। প্রতি আরবি মাসের ১৩, ১৪ এবং ১৫ তারিখ রোজা রাখাও নবী সাঃ এর সুন্নত। আবার প্রতি সপ্তাহের সোমবার এবং বৃহস্পতিবার রোজা রাখাও নবীর সুন্নত এবং একটি মুস্তাহাব (ভাল) ইবাদত। আবার শাওয়াল মাসে অর্থাৎ, রমজানের পরের মাসে যে মাসে ইদ পালন করা হয় সেই মাসে ছয়টি রোজা রাখা খুবই ভাল ইবাদত বলে ইসলামে চর্চা হয়ে আসছে। তবে ইসলামে ইদের দিন কেও চাইলেও রোজা রাখতে পারবেন না। ইদের দিন রোজা রাখা হারাম বা নিষিদ্ধ ।

History of Fasting in Ramadan 1 রোজার ইতিহাস

উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য রোজার ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো রমজান মাস পবিত্র কুরআন নাযিলের মাস। এই মাসে মানবজাতির জন্য পথপ্রদর্শক কিতাব কুরআন শরীফ রাসুল হযরত মুহাম্মদ সাঃ এর উপর নাযিল হওয়া শুরু হয় এবং তিনি নবী ও রাসূল হিসেবে ঘোষিত হন। একারণে ইসলামের ইতিহাসের সাথে রোজার ইতিহাস খুব গভীরভাবে এবং আনন্দের সাথে জড়িত। 

বলে রাখা ভাল, আব্রাহামিক ধর্মসমূহের সকল ধর্মেই রোজা পালনের চল রয়েছে। ইহুদি ও খ্রিস্টানগণ নিজ নিজ প্রথা অনুসারে রোজা পালন করেন। পৃথিবীর প্রায় সকল ধর্মেই অবশ্য উপবাসের চর্চা কম বেশি লক্ষণীয়।

History Gurukul [ ইতিহাস গুরুকুল ] GOLN logo

 

ইসলামে রোজা মূলত মানুষের অন্তর থেকে পাপ, হিংসা, অনাচার দূর করার একটি ইবাদত। রমজান মাস সংযম বা আত্মশুদ্ধির মাস হিসেবে হাজার বছর ধরে ইসলামে পবিত্রতা ও সম্মানের সাথে চর্চা হয়ে আসছে। আর ভারতীয় উপমহাদেশে এবং বাংলাদেশে রমজান মাস ইবাদতের সাথে আনন্দ ও নিজেদের সংস্কৃতি মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। ঢাকার চকবাজারসহ সারা বাংলাদেশে ইফতার সামগ্রীর ব্যবসায় এর চল এই রমজান মাস থেকেই এসেছে। ইদের কেনাকাটা থেকে অন্যান্য প্রস্তুতি, যাকাত প্রদান, তারাবীর নামাজ পড়া সহ নানা আয়োজনে রমজান এখন একটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সংস্কৃতি হয়ে উঠেছে। 

আরো পড়ুন:

 

 

আরও দেখুন…

“রোজার ইতিহাস”-এ 2-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন