বাংলাদেশ নামের উৎপত্তি ও তার প্রাসঙ্গিক ইতিহাস – সুপ্তিকণা মজুমদার

ভৌগলিক ও প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যে অনন্য বাংলাদেশ একটি নতুন রাষ্ট্র। নদ-নদী, বিশাল ও উর্বর সমতলভূমি, পাহাড় ঘেরা সুজলা-সুফলা শ্যামলা দেশ অদ্বিতীয়। বাংলাদেশ বিশ্বসভায় রাষ্ট্র হিসেবে অভ্যুদয় হলেও ভূখণ্ডের অস্তিত্ব নতুন নয়। ফলে এ ভূখণ্ডের ইতিহাস প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী। এ ভূখণ্ডকে যে বিশ্বসভায় বাংলাদেশ নামে অভিহিত করা হয়েছিল তার এক বৃহৎ প্রাচীন ঐতিহাসিক পটভূমি রয়েছে। কিন্তু উপাদানের অভাবে সে ইতিহাস আজও অস্পষ্ট। তবুও বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক, সাহিত্যিক, লেখমালা-ভিত্তিক উপাদানের মাধ্যমে সুদূর প্রাচীনকাল থেকে বিভিন্ন পর্যায় অতিক্রম করে কিভাবে বাংলাদেশ নামে এই নতুন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় হলো সে পটভূমির বিভিন্ন তথ্য উপস্থাপন করাই এ প্রবন্ধের উদ্দেশ্য।

বাংলাদেশ নামের উৎপত্তি ও তার প্রাসঙ্গিক ইতিহাস - সুপ্তিকণা মজুমদার, Flag of Bangladesh, বাংলাদেশের পতাকা
Flag of Bangladesh, বাংলাদেশের পতাকা

বাংলাদেশ নামের উৎপত্তি, প্রাসঙ্গিক ইতিহাস – প্রত্নতাত্ত্বিক দিক :

রাষ্ট্র হিসেবে নতুন হলেও বাংলাদেশের রয়েছে সুপ্রাচীন এক ঐতিহ্য, গৌরবোজ্জ্বল সভ্যতা ও সংস্কৃতির ইতিহাস। নব্য প্রস্তরযুগ থেকেই এ ভূখণ্ডে মানবজাতির অস্তিত্বের কিছু কিছু নিদর্শন এখনও মাঝে মাঝে বাংলাদেশের স্থানে স্থানে আবিষ্কৃত হয়। এ সব নিদর্শন বাংলাদেশের প্রাচীন নির্দেশনকে সূচিত করে।

বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে প্রাপ্ত প্রত্ন, নব্য প্রস্তর এবং তাম্রযুগের অস্ত্রশস্ত্রাদির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো নরসিংদীর বেলাবো উপজেলার উয়ারী ও বটেশ্বর গ্রামদ্বয় থেকে প্রাপ্ত প্রত্ন ও নব্য প্রস্তরযুগের এবং লৌহযুগের আবিষ্কৃত কিছু প্রত্নতাত্ত্বিক সম্ভার। এগুলোর মধ্যে প্রত্ন প্রস্তরযুগের হস্ত কুঠার (hand axe), কুঠার (celt), নব্য প্রস্তরযুগের বাটালি (chisel), ছুরি, কুঠার এবং লৌহ যুগের আকরিক লোহার তৈরি ত্রিকোনাকার হাতকুড়াল, লোহার ফলক, ছুরি, বাটালি, লোহার তৈরি ভারী হাতুড়ি, প্রচুর ছাপাঙ্কৃত রৌপ্যমুদ্রা (Punch marked and cost coin), মূল্যবান পাথরের গুটিকা (Beads of semi precious stone), পোড়ামাটির ক্ষেপণীয় গোলক ও গুলতি (sling ball), এবড়ো-থেবড়ো এবং দীর্ঘগলদেশযুক্ত মৃৎপাত্র, শিলনোড়া, পাথর ও পোড়ামাটির শিবলিঙ্গ ইত্যাদি।

উয়ারী ও বটেশ্বরের অবস্থান রাজধানী ঢাকা থেকে ৭০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র ও আড়িয়ালখার মিলনস্থলের ৩ কিলোমিটার পশ্চিমে কয়রা নামক একটি প্রাচীন নদীখাতের দক্ষিণ তীরে। এই গ্রামদ্বয় থেকে যে পরিমাণ প্রাগৈতিহাসিক যুগের নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে বাংলাদেশের আর কোথাও অনুরূপ নিদর্শন পাওয়া যায়নি।

বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে প্রাপ্ত ঐ যুগের আরও কিছু নিদর্শনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ১৮৮৬ খ্রিষ্টাব্দে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড পাহাড়ে আবিষ্কৃত অশ্মীভূত কাঠের তৈরি একটি ছুরি। বিশেষজ্ঞগণ এ চুরির সঙ্গে ব্রহ্মদেশের ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কাতানের আকৃতিগত সামঞ্জস্য খুঁজে পেয়েছেন। সীতাকুণ্ড পাহাড় থেকে এ ধরনের আরও পাঁচটি হাতিয়ার পাওয়া গিয়েছিল। বর্তমানে এগুলোর একটি কলকাতা জাদুঘরে ও চারটি ব্রিটিশ জাদুঘরে রক্ষিত আছে।

১৯৬৩ খ্রিষ্টাব্দে বৃহত্তর নোয়াখালী অঞ্চলের আমজাদাতা ইউনিয়নের অন্তর্গত ছাগলনাইয়া থানায় পাওয়া গেছে প্রত্নপ্রস্তর যুগে ব্যবহৃত একটি প্রস্তর নির্মিত হাতকুড়াল। এটি বর্তমানে ঢাকার জাতীয় জাদুঘরের প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে।

এছাড়া ১৯৫৮ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটিতেও অনুরূপ একটি অস্ত্র আবিষ্কৃত হয়েছিল। বর্তমানে এটি বাংলাদেশের বন্দর নগরী চট্টগ্রামের জাতিতাত্ত্বিক জাদুঘরের সংরক্ষণে রয়েছে।

বৃহত্তর কুমিল্লা জেলায় ময়নামতি অঞ্চলে প্রত্নতাত্ত্বিক খননেও অনুরূপ প্রত্ন ও নব্যপ্রস্তর যুগে ব্যবহৃত মসৃণ-অমসৃণ সরু বাটওয়ালা হাতকুড়াল ও বাটালির সন্ধান পাওয়া গেছে। এছাড়াও রৌপ্য বা তাম্রপাতের ছাপাঙ্কৃত উভয় পার্শ্বে এক বা একাধিক প্রতীক উৎকীর্ণ অতি প্রাচীন কিছু মুদ্রা আবিষ্কৃত হয়েছে। ড. নলিনীকান্ত ভট্টশালী এই মুদ্রাগুলো খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ-তৃতীয় শতকের মৌর্যপূর্ব ও মৌর্য যুগের বলে মনে করেন (২)।

বাংলাদেশ নামের উৎপত্তি, প্রাসঙ্গিক ইতিহাস – অন্যান্য ইতিহাস :

বর্তমানে এ ভূখণ্ডের নাম বাংলাদেশ হলেও ইতিহাস, সাহিত্যিক, প্রত্নতাত্ত্বিক ও পর্যটকদের ভ্রমণকাহিনি এবং অন্যান্য উপাদান পর্যালোচনা করলে দেখা যায় প্রাচীনকালে কোনো নির্দিষ্ট নামে এ ভূখণ্ড পরিচিত ছিল না। বিভিন্ন সময় এ ভূখণ্ডকে বিভিন্ন নামে অভিহিত করা হতো। প্রাচীনকালে বাংলাদেশের নির্দিষ্ট কোনো সীমা ছিল না। যুগে যুগে এর সীমা ও আয়তনের পরিবর্তন হয়েছে।

খ্রিষ্টপূর্ব ৩য় শতাব্দী বা এ সময়ের পূর্বে বঙ্গভূমি অর্থাৎ বাংলা ভাষাভাষী পূর্বপুরুষদের নিবাসভূমির আয়তন অনেক বৃহৎ ছিল। বর্তমান বিহারের কিছু অংশ ও কামরূপ পর্যন্ত পূর্ব ভারতের বেশ কিছু অংশ এবং উত্তর হিমালয়ের পাদদেশ পর্যন্ত প্রাচীন বঙ্গভূমি বিস্তৃত ছিল। অর্থাৎ বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা নিয়ে ছিল বৃহত্তর বঙ্গদেশ।

এ তিন অঞ্চলের মানুষের আচার-আচরণ, আহার, ব্যবসা বাণিজ্য, কৃষি, গৃহনির্মাণ ও গো-পালন ইত্যাদি ক্ষেত্রে বিশেষ ঐক্য লক্ষ করা যায়। বিহারের সঙ্গে বাংলার ঐক্যের একমাত্র মাধ্যম মূলত গঙ্গা নদী। গঙ্গা সর্বকালে বাংলার মেরুদণ্ড ছিল। প্রাচীনকালে যে উড়িষ্যা বঙ্গভূমির অন্তর্ভুক্ত ছিল তা বর্তমানের সম্পূর্ণ উড়িষ্যা নয় । কাঁসাই নদীর ওপারে পশ্চিমবঙ্গ ও তৎসংলগ্ন উড়িষ্যার উত্তরাংশ বঙ্গভূমির অন্তর্গত ছিল।

প্রাচীনকালের শেষ পর্যায়েও বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল বিভিন্ন নামে অভিহিত হত। তখন পশ্চিমবঙ্গ রাঢ় এবং উত্তরবঙ্গ বরেন্দ্র ও পুন্ড্রবর্ধন নামে অভিহিত হত। উত্তর ও পশ্চিম বাংলার কিছু অংশ গৌড় নামে পরিচিত ছিল। পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব বাংলা বঙ্গ সমতট, বঙ্গাল ও হরিকেল নামে খ্যাত ছিল। তবে বঙ্গজাতি বা বঙ্গদেশ আদি পর্যায় থেকে সমধিক পরিচিত ছিল।

প্রত্নতাত্ত্বিক, লেখমালাভিত্তিক, সাহিত্যিক তথ্য থেকে জানা যায়, বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ উভয়েই প্রাচীনকালে বঙ্গদেশ বা বঙ্গভূমি বা শুধু বঙ্গ নামে পরিচিত ছিল। মুসলমান যুগে সমগ্র বঙ্গ ‘বাঙ্গালা’ নামে পরিচিত ছিল। মুসলিম ঐতিহাসিকদের উচ্চারণে বঙ্গ বা বঙ্গাল বাঙ্গালা নামে উচ্চারিত হতো। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পর ভারতীয় উপমহাদেশের পূর্বাঞ্চল পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয় পূর্ব বাংলা নামে। ১৯৫৫ সালে এর নাম হয় পূর্ব পাকিস্তান। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের পূর্ব পর্যন্ত বাংলাদেশ পূর্ব পাকিস্তান নামে পাকিস্তানের প্রদেশ ছিল।

বাঙ্গালা শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেছেন মুসলিম ঐতিহাসিক জিয়াউদ্দীন-বুরানি। তিনি যে অঞ্চলকে বাঙ্গালা নামে অভিহিত করেছেন সে অঞ্চল গঠিত হয়েছিল। লখনৌতি৪ (প্রাচীন লক্ষণাবতী), সাতগাঁ (৫) এবং সোনারগাঁও (৬) প্রভৃতি মিলিত অঞ্চল নিয়ে (৭)।

ঐতিহাসিক মীনহাজউদ্দীন তাঁর ‘তবাকৎ-ই-নাসিরী’ গ্রন্থে যে অঞ্চলকে বঙ্গ হিসেবে অভিহিত করেছেন তা শুধু বাংলার পূর্বাঞ্চলকে বোঝাত (৮)।

বুরানি বাংলাদেশ শব্দটি ব্যবহার করেছেন বিশেষ অভিধায়। সেগুলো হলো-আরস্ বাঙ্গালাহ, ইকলিম বাঙ্গালাহ এবং ডিয়ার বাঙ্গালাহ (৯)। বিভিন্ন তথ্য প্রমাণের আলোকে আরস্ বাংলা হল সাতগাঁও অঞ্চল, ইকলিম বাংলা হলো সোনারগাঁ অঞ্চল এবং ডিয়ার বাংলা গঠিত হয়েছিল সাতগাঁ ও সোনারগাঁ উভয়ের মিলিত অঞ্চল (১০)। ডিয়ার বাংলার রাজধানী ছিল সোনারগাঁয়ে। সুলতান ফকরুদ্দীন মোবারক শাহের সময় পর্যটক ইবনে বতুতা যে বাংলা প্রত্যক্ষ করেছিলেন সেটা গঠিত হয়েছিল সোনারগাঁ (ডিয়ার বাংলা) এবং বৃহত্তরভাবে ইকলিম লখনৌতি অঞ্চল ও গোয়াসহ উত্তরবঙ্গ নিয়ে (১১)।

এ সব প্রমাণাদির সাক্ষ্যে বোঝা যায় বঙ্গ এবং বাঙ্গালা শব্দগুলো মুসলিম ঐতিহাসিকরা নির্দিষ্ট অঞ্চলের জন্য ব্যবহার করত। সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াছ শাহের সময় বাংলা তিনটি অঞ্চলে বিভক্ত ছিল। যথা- লখনৌতি, সাতগাঁ, সোনারগাঁ। এ তিনটি অঞ্চলের সমন্বিত নাম ছিল শাহ-ই-বাঙ্গালা (১২)। তখন থেকে ইউরোপীয় বণিকরা এ ভূখণ্ডে বসবাস করার পূর্ব পর্যন্ত বাঙ্গালাহ একটি দেশ হিসেবে পরিচিত ছিল। এর পরিধি ছিল দক্ষিণে সমুদ্র উপকূল থেকে উত্তরে হিমালয়ের তেলিয়াগড়ি পর্যন্ত। সম্রাট আকবরের সময় এ অঞ্চল পরিচিত ছিল ‘সুবাহ্ বাঙ্গালা’ নামে।

উপর্যুক্ত বঙ্গ অঞ্চলটি নির্দেশ করেছে পূর্ব বাংলার ব্রহ্মপুত্র নদের বাম উপত্যকা এবং আরো পূর্ব দিকের গাঙ্গেয় ব-দ্বীপ অঞ্চলকে। বঙ্গের এ সীমার সমর্থন রয়েছে মীনহাজউদ্দীনের বর্ণনায়। তার বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে- লক্ষ্মণ সেন নদীয়া ত্যাগ করে যে বঙ্গে চলে গিয়েছিলেন, সে অঞ্চলের বিস্তৃতি ছিল বৃহত্তর ঢাকার সোনারগাঁ এলাকা পর্যন্ত। এ থেকে বোঝা যায় তুর্কীদের বঙ্গ বিজয় অবধি বঙ্গ জনপদ পূর্ব বাংলার ব্রহ্মপুত্র নদের বহিঃসীমা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।

এ সময় বঙ্গ এবং বঙ্গাল দুটি স্বতন্ত্র জনপদে বিভক্ত ছিল, পরবর্তীকালে উভয় অঞ্চলের নাম হয় পূর্ববঙ্গ। বঙ্গের এ সীমাকে সঠিক বলে শনাক্ত করেছেন জিয়াউদ্দীন-বুরানি। তাঁর বর্ণনা থেকে জানা যায়, নদী পরিবেষ্টিত বাঙ্গালা অঞ্চল লখনৌতি থেকে স্বতন্ত্র ছিল। ব্রিটিশ শাসন আমলে ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দে পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গ নামে বঙ্গকে দুভাগে বিভক্ত করা হয়েছিল। বঙ্গভঙ্গের ফলে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল হিসেবে পূর্ববঙ্গ স্বতন্ত্র প্রদেশের মর্যাদা পায়।

বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামের পর ১৯১১ খ্রিষ্টাব্দে বঙ্গভঙ্গ রদ করা হয়। কিন্তু বঙ্গভঙ্গ রদ করা হলেও বঙ্গদেশ তার পূর্ববর্তী সীমানা ফিরে পায়নি। শুধু পূর্ববঙ্গ ও দার্জিলিংসহ পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে বঙ্গদেশ গঠিত হয়। তখন আসাম, বিহার, উড়িষ্যা পৃথক প্রদেশ হিসেবে গঠিত হয়। এর ফলে বাংলা ভাষাভাষী সিলেট, কাছাড় ও গোয়ালপাড়ার কিছু অংশ আসামের অংশ হিসেবে থেকে যায়। বিহার ও ছোটনাগপুরের বাংলা ভাষাভাষী কিছু অঞ্চলও আসামের অন্তর্ভুক্ত হয় ।

দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পর ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারত-বিভক্তির পূর্ব পর্যন্ত বর্তমান বাংলাদেশ ছিল তদানীন্তন ব্রিটিশ-ভারতের অন্তর্গত ‘বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির’ পূর্বাঞ্চল। তখন এই অংশের নাম ছিল ‘পূর্ব বাংলা’। ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত হয়ে ভারতবর্ষ স্বাধীনতা লাভ করে। স্বাধীনতা লাভের পর ভারতবর্ষ ভারত ও পাকিস্তান এ দুভাগে বিভক্ত হয়। উল্লেখ্য, ভারত-বিভক্তির সাথে সাথে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সিও দুভাগে বিভক্ত হয়।

এর পশ্চিমাংশ ‘পশ্চিমবঙ্গ’ নাম নিয়ে প্রজাতন্ত্রী ভারত ইউনিয়নের অঙ্গীভূত হয়ে যায় এবং পূর্ব বাংলা’ নব গঠিত পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চল হিসেবে পাকিস্তানের সাথে যুক্ত হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে পূর্ব বাংলা নামে পরিচিত হলেও ১৯৫৬ সালে পাকিস্তান নামের সাথে সামঞ্জস্য রেখে এ অঞ্চলের নামকরণ করা হয় ‘পূর্ব পাকিস্তান’। এভাবে অতিবাহিত হয় অনধিক প্রায় ২৪ বৎসর।

এই সময় থেকে পাকিস্তানি শাসন-শোষণে অতিষ্ঠ হয়ে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ ঘোষণা করে এবং দীর্ঘ নয় মাসব্যাপী এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর ১৬ ডিসেম্বর অর্জন করে এক অনন্য ও অবিস্মরণীয় মহান বিজয়। এভাবে অভ্যুদয় ঘটে স্বতন্ত্র, স্বাধীন ও সার্বভৌম নতুন এক রাষ্ট্রের। আর নতুন এই রাষ্ট্র বিশ্বসভায় পরিচিত হয় ‘বাংলাদেশ’ নামে।

 

 

মুক্তিযুদ্ধ



বর্তমান স্বাধীন বাংলাদেশ ভূখণ্ডের অবস্থান হলো ভারতীয় উপমহাদেশের পূর্ব প্রান্তে ২০-৩০ ও ২৭-০ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৯৮-০ ও ৯৩-০ পূর্ব দ্রাঘিমাংশের মধ্যবর্তী প্রায় ৫৫,৫৯৮ বর্গমাইল ভূমিভাগ নিয়ে। মূলত পদ্মা, মেঘনা, যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র প্রভৃতি নদীবাহিত পলি দ্বারা এ ভূখণ্ড গঠিত। এ ভূভাগের পূর্ব প্রান্তে রয়েছে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য ও আসাম প্রদেশের পার্বত্যাঞ্চল, উত্তরে শিলং উপত্যকা ও নেপালের তরাই অঞ্চল, পশ্চিমে ভারতের পশ্চিম বাংলা প্রদেশ ও বিহারের রাজমহল পাহাড়ের অংশ বিশেষ এবং দক্ষিণে চিরগর্জনশীল বিশাল বঙ্গোপসাগর।

বিভিন্ন প্রাচীন সাহিত্যিক ও লেখমালা ভিত্তিক সাক্ষ্যে জানা যায় যে, মুসলিম পূর্ব সময়ে বাংলাদেশ কয়েকটি জনপদে বিভক্ত ছিল। এগুলো হলো : (ক) পুণ্ড্রবর্ধন, (খ) বরেন্দ্র, (গ) বঙ্গ, (ঘ) বঙ্গাল, (ঙ) সমতট, (চ) হরিকেল, (ছ) চন্দ্রদ্বীপ এবং (জ) পট্টিকেরা। জনপদগুলোর জন্য যে সমস্ত নাম ব্যবহার করা হয়েছে, সেগুলো আপাতদৃষ্টিতে ভৌগোলিক বলে মনে হলেও বাস্তবে সেগুলো ছিল সব গোষ্ঠী নাম। যেমন, বঙ্গ, পুণ্ড্র প্রভৃতি।

জাতিবাচক এই সমস্ত নাম ব্যবহারের দ্বারা বঙ্গজাতি বা পুণ্ড্রজাতিকে বোঝাত। সাধারণত ভৌগোলিক নিয়মে, যদি কোনো অঞ্চলে কোনো জাতি বা গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করে, তবে কালক্রমে সে অঞ্চলে বসবাসরত জাতি বা গোষ্ঠীর নামে পরিচিত হয়। বঙ্গ ও পুণ্ড্রের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে।

এই জনপদসমূহের মধ্য বঙ্গ এবং বঙ্গাল গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল নিয়ে গঠিত ছিল। লেখমালাসমূহের মধ্যে খ্রিষ্টীয় তৃতীয় শতাব্দীর নাগার্জুনকুণ্ড লিপি (১৩) ও চতুর্থ শতাব্দীর মেহরৌলি লৌহস্তম্ভ লিপিতে (১৪) একটি ভৌগোলিক অঞ্চল হিসেবে বঙ্গের সর্ব প্রাচীন উল্লেখ রয়েছে। তবে এই লিপিগুলোতেও বঙ্গের অবস্থান সম্পর্কে নির্দিষ্ট করে কিছু বলা হয়নি।

প্রাচীন সাহিত্যিক ও নৃতাত্ত্বিক প্রমাণাদির সাক্ষ্যে দেখা যায়, বাংলাদেশের প্রাচীন জনপদসমূহের অন্যতম বঙ্গ। বৈদিক সংহিতায় এর কোনো উল্লেখ নেই (১৫)। তবে ঋগ্‌বেদের একটি শ্লোকে পরোক্ষভাবে বঙ্গের উল্লেখ আছে ‘প্রজাহ্ তিস্রো অত্যায়মীষু ন্যার্ন্যা অকর্মভিতো বিবিসে’ (০৮.১০১.১৪) অর্থাৎ তিনি প্রজা অতিক্রম করে গমন করেছিলেন। অন্য প্রজাগণ অর্চনীয় অগ্নির চতুর্দিক আশ্রয় করেছিল। এই শ্লোকাংশের প্রথম ব্যাখ্যা করা হয়েছিল ঐতরেয় আরণ্যকে।

সে ব্যাখ্যায় বঙ্গ শব্দের সরাসরি উল্লেখ রয়েছে। এ থেকে বোঝা যায় বঙ্গ শব্দটির সর্ব প্রথম উল্লেখ রয়েছে ‘ঐতরেয় আরণ্যকে’। কিন্তু তা কোনো ভৌগোলিক অঞ্চল হিসেবে নয়, আর্যসভ্যতা-বহির্ভূত একটি জাতি তথা গোষ্ঠী হিসেবে। বঙ্গ সম্পর্কে এতে বলা হয়েছে “বয়াংসি বঙ্গ-বগধাশ্চেরপাদাঃ”।। এই বাক্যাংশের অর্থ সুস্পষ্ট নয় এবং পণ্ডিতেরা এর বিভিন্ন ভাষ্য দিয়েছেন। বগধাঃ শব্দটি যে মগধ শব্দটির জন্য ব্যবহৃত হয়েছে এ বিষয়ে পণ্ডিতেরা মোটামুটি একমত।

বাক্যাংশটির অর্থ সম্ভবত হবে এই যে, বঙ্গ, মগধ, চের গোষ্ঠীর লোকদের ভাষা ছিল পাখির ভাষার মতো অবোধ্য। এতে এই সমস্ত গোষ্ঠীর প্রতি আর্যভাষীদের ঘৃণাই স্পষ্টত প্রকাশ পেয়েছে। আরণ্যক পূর্ববর্তী প্রাচীন বৈদিক সাহিত্যে বঙ্গ ও সমসাময়িক অন্যান্য গোষ্ঠীর অনুল্লেখ এবং পরবর্তী বৈদিক সাহিত্যে এদের উল্লেখ তাৎপর্যবাহী। আমরা জানি যে, আরণ্যক সাহিত্যসমূহ বৈদিক সাহিত্য পরম্পরায় অনেক পরবর্তীকালের রচনা।

এই সময় আর্যভাষীদের অধিকারভুক্ত ছিল গাঙ্গেয় উপত্যকার অধিকাংশ অঞ্চল। তাই পরবর্তী সাহিত্যে এদের উল্লেখ আছে। কিন্তু প্রাথমিক পর্যায়ে আর্যরা এ অঞ্চলে প্রাধান্য বিস্তার করতে পারেনি বলেই এ সমস্ত গোষ্ঠীর প্রাচীনতর রচনায় বঙ্গের অনুল্লেখ সহজেই বোধগম্য। এখানে চেরপাদ বলতে সম্ভবত দাক্ষিণাত্যের চেরদেশের কথা বলা হয়েছে।

বঙ্গের অবস্থান বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ লিপি হল সমাচার দেবের (আ. খ্রি. ৬ষ্ঠ শতাব্দী) ঘুঘ্রাহাটি তাম্রলিপি (১৭)। এতে বঙ্গের দুটি বিভাগের উল্লেখ আছে। এগুলো হলো যথাক্রমে বিক্রমপুরভাগ ও নব্যাবকাশিকা। পূর্ব বাংলার বৃহত্তর প্রাচীন নগর বিক্রমপুর। এই বিক্রমপুর থেকেই সেন রাজাদের বিভিন্ন তাম্রলিপি প্রদত্ত হয়েছিল। তাছাড়া চন্দ্ৰ, বর্মণ, সেন ও দেববংশীয় রাজাদের রাজধানী ছিল বিক্রমপুরে। সেন রাজাদের রাজধানী বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন স্থানে স্থানান্তরিত হয়েছিল।

ফলে সেন বংশের রাজত্বকালে কয়েকটি রাজধানীর উল্লেখ থাকলেও বিক্রমপুর ছিল সর্বপ্রধান। বিক্রমপুর নামে একটি পরগনা এখনও ঢাকা জেলার মুন্সীগঞ্জ মহকুমা ও ফরিদপুর জেলার কিছু অংশ জুড়ে বিস্তৃত। কিন্তু প্রাচীন দলিলে বিক্রমপুর নামে যে প্রাচীন গ্রামের উল্লেখ রয়েছে, ঢাকা-ফরিদপুরের কোথাও এই নামে কোনো গ্রাম নেই। নব্যাবকাশিকা ছিল বৃহত্তর ঢাকা ও ফরিদপুর অঞ্চলের দক্ষিণে পদ্মা-মেঘনা ও ব্রহ্মপুত্রের পলি গঠিত কোনো নতুন চরাঞ্চল।

সম্ভবত রাজা ও রাজপরিবারের সদস্যরা সেখানে সময়ে সময়ে সাময়িকভাবে অবকাশ যাপন করতেন। মূল শাসনকেন্দ্র সুবর্ণবীথি ছিল নব্যাবকাশিকার অন্তর্গত। নীহাররঞ্জন রায় এ স্থান ঢাকা অঞ্চলে বলে মনে করেন। কারণ সুবর্ণবীথি নামের সঙ্গে বৃহত্তর ঢাকা জেলার সোনারগাঁও (সং সুবর্ণগ্রাম), সোনারং ও সোনাকান্দা প্রভৃতি স্থানের নামের মিল রয়েছে (১৮)

এক্ষেত্রে মূল শব্দ সুবর্ণ (বাংলায় সোনা বা স্বর্ণ) তাৎপর্যপূর্ণ। তাছাড়া, ঘুঘ্রাহাটি তাম্রলিপি থেকে আরও জানা যায়, সমুদ্রের নিকটবর্তী বারকমণ্ডল সুবর্ণবীথির অন্তর্গত ছিল। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, রাজা কর্তৃক দানকৃত বারকমণ্ডল বিষয়ের অন্তর্গত ধ্রুবিল্লাটি গ্রামকে বর্তমান ফরিদপুর শহরের নিকটবর্তী ধুলটগ্রাম বলে পণ্ডিতেরা শনাক্ত করেছেন (১৯)।

বাংলাদেশের ইতিহাসে মধ্যযুগের আদি পর্ব থেকেই বঙ্গের সাথে ধ্বনিতাত্ত্বিক ও ব্যুৎপত্তিগত সাদৃশ্যযুক্ত বঙ্গাল নামে একটি নতুন জনপদের কথা শোনা যায়। এটি ছিল সম্পূর্ণ পৃথক একটি জনপদ। মধ্যযুগের শেষ ভাগে রচিত তন্ত্রবিষয়ক গ্রন্থ ‘ডাকার্ণব’ এ বলা হয়েছে যে, বঙ্গাল ছিল বঙ্গ ও হরিকেল থেকে সম্পূর্ণ পৃথক একটি প্রশাসনিক অঞ্চল (২)। খ্রিষ্টীয় পঞ্চদশ শতাব্দীতে রচিত নয়চন্দ্র সুরীর ‘হম্মীর মহাকাব্যে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে বঙ্গ ও বঙ্গাল ছিল পৃথক দুটি ভৌগোলিক অঞ্চল (২১) । 

একটি পৃথক জনপদ হিসেবেও বঙ্গাল যে কত সুপরিচিত ছিল তা খ্রিষ্টীয় ষোড়শ শতাব্দীর তিব্বতীয় ঐতিহাসিক লামা তারনাথের বর্ণনা থেকে জানা যায়। তারনাথ বঙ্গালকে ‘ভঙ্গল’ নামে অভিহিত করেছেন (২২)। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে কুমিল্লা অঞ্চলের ময়নামতিতে প্রত্নতাত্ত্বিক খননের ফলে আবিষ্কৃত একটি স্বর্ণমুদ্রায় খ্রিষ্টীয় সপ্তম-অষ্টম শতাব্দীর উৎকীর্ণ লিপিতে ‘শ্রীভঙ্গল-মৃগাঙ্কস্য’ কথাটি আছে।

ময়নামতিতে প্রত্নতাত্ত্বিক খননকালে প্রাপ্ত প্রাচীন দেববংশীয় রাজা আনন্দদেব ও ভবদেবের দুখানি তাম্রলিপির ওপরে সংযুক্ত সীলে এই একই কথা লিখিত আছে (২৩)।  দেববংশীয় এই রাজারা খ্রিষ্টীয় ৮ম শতাব্দীর প্রথম ভাগে উত্তরবঙ্গে পালদের ক্ষমতা বিস্তারের পরে একই শতাব্দীর দ্বিতীয় ভাগে দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় ক্ষমতাসীন ছিলেন।

এ থেকে মনে হয় যে ‘শ্রীভঙ্গল মৃগাঙ্ক’ ছিল আনন্দদেব ও তাঁর পুত্র ভবদেবের একটি ‘বিরূদ’ বা প্রশস্তিসূচক উপাধি যার অর্থ ‘ভঙ্গলের চন্দ্র’। তিব্বতীয় পণ্ডিত তারনাথ ভৌগোলিক অঞ্চল বোঝাতে ভঙ্গল নামের ব্যবহার করেছেন। ভৌগোলিক অঞ্চল হিসেবে বিচার করলে ‘শ্রীভঙ্গল-মৃগাঙ্ক’ শব্দের ব্যবহার অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

স্থানবাচক ‘ভঙ্গল’ শব্দটি সম্ভবত সংস্কৃত ‘বঙ্গাল’ শব্দের তিব্বতীয় উচ্চারণের ফলস্বরূপ। এ প্রসঙ্গে আরও বলা যেতে পারে যে, তারনাথ তাঁর বর্ণনায় ভঙ্গলের (অর্থাৎ বঙ্গালের) কথা বলতে গিয়ে জনপদ হিসেবে রাঢ় ও বরেন্দ্রের উল্লেখ করেছেন। এ থেকে মনে হয় যে তারনাথ ভঙ্গল বলতে সম্ভবত বর্তমান বাংলাদেশের সমগ্র দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলকে বুঝিয়েছেন।

একটি পৃথক ভৌগোলিক অঞ্চল হিসেবে বঙ্গালের লেখমালা ভিত্তিক সর্ব প্রাচীন উল্লেখ পাওয়া যায় রাষ্ট্রকুটরাজ ৩য় গোবিন্দের (৭২৭ শকাব্দ/আঃ ৮০৫ খ্রি.) পাটান (নেসারিকা) তাম্রলিপিতে। এতে ধর্মকে (সম্ভবত পালরাজ ধর্মপালকে) বঙ্গালের রাজা বলে উল্লেখ করা হয়েছে (২৪)।

রাজেন্দ্র চোলের (আ. ১০২৪ খ্রি.) তিরুমালাই প্রস্তরলিপিতে ‘বঙ্গালদেশম্’ রাজ্যের রাজা রূপে গোবিন্দচন্দ্রের নাম দেখা যায়। সেখানে বঙ্গালদেশম রাজ্যকে বর্ণনা করা হয়েছে এভাবে-“যেখানে বৃষ্টি কখনও থামে না” (২৫)। দণ্ডভুক্তি, উত্তররাঢ় ও দক্ষিণরাঢ় থেকে এটি সম্পূর্ণ পৃথক এক রাজ্য ছিল। বঙ্গালদেশমের রাজা গোবিন্দচন্দ্রকে দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার চন্দ্রবংশীয় রাজা গোবিন্দচন্দ্র বলে শনাক্ত করা হয়েছে (২৬)।

কলচুরিরাজ বিজ্জলের (আ ১১৫৭-৬৭ খ্রি.) আবলুর লিপিতে বঙ্গ ও বঙ্গালকে পৃথক রাজ্য রূপে বর্ণনা করা হয়েছে (২৭)। চন্দ্রবংশীয় রাজা শ্রীচন্দ্রের (খ্রি. ১০ম শতাব্দী) রামপাল তাম্রলিপিতে চন্দ্ৰদেবকে চন্দ্রদ্বীপের অধিপতি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। উল্লেখ্য ডি.সি. সরকার প্রমুখ পণ্ডিতেরা চন্দ্রদ্বীপকে বর্তমান বরিশাল জেলার বালা অঞ্চলের অন্তর্গত বলে মনে করেন।

এ থেকে মনে হয় যে দক্ষিণ বাংলার সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চলেই হলো এর অবস্থান। রাজা শ্রীচন্দ্র তাঁর পশ্চিমভাগ লিপিতে সিলেট অঞ্চলে ‘বঙ্গাল’ মঠ ও ‘দেশান্তরীয়’ মঠের উল্লেখ করেছেন। বঙ্গাল মঠের এই উল্লেখ নিঃসন্দেহে প্রমাণ করে যে বঙ্গালের সীমানা উত্তর-পূর্ব দিকে সিলেট পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল (২৮)।

উপর্যুক্ত বিভিন্ন তথ্য প্রমাণাদির ভিত্তিতে এইচ সি রায় চৌধুরী এক সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে বঙ্গ এবং বঙ্গাল দুটো পৃথক ভৌগোলিক অঞ্চলে বিভক্ত ছিল। পরবর্তীকালে চন্দ্রদ্বীপও বঙ্গের অন্তর্ভুক্ত হয়। সেনবংশীয় রাজ বিশ্বরূপসেনের সাহিত্য পরিষৎ তাম্রলিপিতে (২৯) বঙ্গালবড়া ও ‘চন্দ্রদ্বীপ’ নামে দুটি স্থানের উল্লেখ আছে। বরিশাল জেলার গৌরনদী থানার রামসিদ্ধি পাটক গ্রামের দক্ষিণাংশকে বঙ্গালবড়া নামে সনাক্ত করা হয়েছে এবং তাম্রলিপিতে উল্লিখিত ‘নন্দ্ৰদ্বীপ’কে পণ্ডিতেরা চন্দ্রদ্বীপ বলে পাঠ করেছেন।

এই পাঠ যথাযথ বলেই মনে হয়। কারণ, দানকৃত গ্রামের মধ্যে একটি হলো ঘাঘরকাট্টি পাটক। পঞ্চদশ শতাব্দীর কবি বিজয়গুপ্তের ‘মনসামঙ্গল’ কাব্যে উল্লেখ রয়েছে তাঁর জন্মস্থান বৃহত্তর বরিশাল জেলার ফুল্লশ্রী গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে ঘাঘর নামের একটি নদী। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে বরিশাল অঞ্চলের স্থান নামের শেষে ‘কাঠি বা কাট্টি শব্দটির বহুল ব্যবহার এখনও প্রচলিত। যেমন, লক্ষণকাট্টি, ঝালকাঠি, স্বরূপকাঠি ইত্যাদি। খ্রিষ্টীয় ত্রয়োদশ শতকে চন্দ্রদ্বীপ যে বঙ্গের অন্তর্ভুক্ত ছিল তা প্রমাণিত হয়।

বঙ্গালের উৎপত্তি হয়েছে ভূমি বিভক্তি থেকে, বঙ্গের সাথে জমির বাঁধ বা আল প্রত্যয় যুক্ত হয়ে বঙ্গাল শব্দের উৎপত্তি হয়েছে। তবে এ বিষয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। খ্রিষ্টীয় ষোড়শ শতাব্দীতে ‘বাঙ্গালাহ্’ শব্দের উৎস অনুসন্ধান করতে গিয়ে সম্রাট আকবরের পারিষদ ঐতিহাসিক আবুল ফজল তাঁর বিখ্যাত ‘আইন-ই-আকবরী’ গ্রন্থে বলেছেন-বাঙ্গালার মূল নাম ছিল বঙ্গ।

বঙ্গের প্রাচীন শাসকগণ সমগ্র প্রদেশব্যাপী ১০ গজ উঁচু এবং ২০ গজ প্রস্থ বিশিষ্ট মাটির ঢিবি বা বাঁধ নির্মাণ করতেন, এগুলোকে বলা হতো আল্। এই আল্ প্রত্যয় হতে বাঙ্গালা নামের উৎপত্তি হয় এবং তা জনসমাজে প্রচলিত হয় (৩০)। (The original name of Bangalah was ‘Bang’. Its former rules raised mounds measuring ten yards in height and twenty in breadth throughout the province, which were called al. Form this suffix the name Bangalah took its rise and currency.)।

এভাবে বিচার করে আবুল ফজল বঙ্গ ও বঙ্গালকে এক করে ফেলেছেন। ডি.সি. সরকার এই একীভূতকরণকে সঠিক নয় মনে করেন। তাঁর মতে, বঙ্গাল নামটি বঙ্গ শব্দ থেকে উদ্ভূত হতে পারে, তবে তা ছিল বঙ্গ শব্দের সঙ্গে প্রাকৃত প্রত্যয় আল-এর সংযোগে (৩১)। বঙ্গাল শব্দের উৎপত্তির ব্যাপারে তাঁর মত হলো- বঙ্গ এলাকার নিম্নাঞ্চলে বন্যার জলোচ্ছ্বাসকে প্রতিরোধ এবং বর্ষাকালে যাতায়াতের সুবিধার জন্য বর্তমান সময়েও উঁচু রাস্তা এবং মাটির বাঁধ নির্মাণ করা হয়।

সুতরাং এ থেকে ধারণা করা যায় যে, পুরাতন বঙ্গের দক্ষিণাঞ্চল এভাবে সর্ব প্রথম বাঙ্গালা নামে পরিচিত হয় (৩২)। (In the lower part of Vanga region very high roads or earthen embankments are constructed even today to prevent the tide of floods and to facilitate communications during the rainy season. It may therefore be suggested that the southern part of old Vanga thus at first came to be known as Vangala.)

রমেশ চন্দ্র মজুমদার উপরোক্ত সিদ্ধান্তের সাথে ঐক্যমত পোষণ করে উল্লেখ করেছেন যে, খ্রিষ্টীয় পঞ্চদশ শতাব্দী থেকে বাঙ্গালা জনপদ আলাদা ভূখণ্ড হিসেবে বিদ্যমান ছিল (৩৩)। তিনি এ বিষয়ে আরও যুক্তি প্রদর্শন করেন যে খ্রিষ্টীয় দ্বাদশ শতকে বঙ্গাল মুসলিম ঐতিহাসিকগণের উচ্চারণে বাঙ্গালা শব্দে রূপান্তরিত হয়েছিল (৩৪)। এই বাঙ্গালাহ্ থেকে পর্তুগীজ বেঙ্গালা এবং ইংরেজি বেঙ্গল শব্দ রূপান্তরিত হয়েছে।

খ্রিষ্টীয় ষোল ও সতেরো শতকে ইউরোপীয়দের এ দেশে আধিপত্য বিস্তারের সময় এ ভূখণ্ড তাদের কাছে বেঙ্গালা নামে পরিচিত ছিল। পরবর্তীকালে ইংরেজ শাসনামলে বেঙ্গালা ‘বেঙ্গল’ বলে অভিহিত হতো। তিনি আরও উল্লেখ করেন বঙ্গ এবং বঙ্গাল নামের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বঙ্গ ও উপবঙ্গ নামে আলাদা দুটো অঞ্চল ছিল এবং এগুলোর অস্তিত্ব ছিল নির্দিষ্ট সময়ের জন্য।

বঙ্গের সাথে বঙ্গ ও উপবঙ্গ এ দুটো অভিধার যোগ থাকলেও এ অঞ্চলগুলোর অবস্থিতির সঠিক কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না (৩৫)। আবুল ফজলও বাঙ্গালাহ্-এর উৎপত্তি বিষয়ে একই মত পোষণ করেন। তবে বৃহৎসংহিতায় উপবঙ্গ নামে একটি জনপদের উল্লেখ রয়েছে।

আনুমানিক ষোড়শ-সপ্তদশ শতকে রচিত দিগ্বিজয় প্রকাশ নামক গ্রন্থেও উপবঙ্গের উল্লেখ রয়েছে। উক্ত গ্রন্থে উপবঙ্গের সীমা নির্দেশ করা হয়েছে যশোর ও তৎসংলগ্ন কয়েকটি বনময় অঞ্চল নিয়ে (৩৬)। যা যশোর এবং সুন্দরবনকে নিয়ে গাঙ্গেয় ‘ব’ দ্বীপের অংশ হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে (৩৭)।

ব্যুৎপত্তিগত পরিবর্তনের মাধ্যমে বঙ্গ শব্দ থেকে বাঙ্গালা শব্দের উদ্ভব হয়েছে। এভাবে দেখা যাচ্ছে সাধারণভাবে প্রাচীন বঙ্গকে নবীকরণের মাধ্যমে বিশেষ করে বহিরাগতদের দ্বারা বাঙ্গালা শব্দটি উৎপত্তি হয়েছে এবং এ অভিধায় সমস্ত দেশ পরিচিত ছিল (৩৮)। তবে একটি বিষয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতৈক্য রয়েছে যে খ্রিষ্টীয় অষ্টাদশ পর থেকে বাঙ্গালা ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে।

উপরোক্ত আলোচনা থেকে বোঝা যায়, মুসলিমরা বঙ্গ এবং বাঙ্গালাকে গ্রহণ করেছিল প্রাচীন বঙ্গ এবং বঙ্গাল শব্দ থেকে। বঙ্গ ও বঙ্গাল শব্দ দুটো সংস্কৃত শব্দ। এ শব্দ দুটোর সাথে বাংলাদেশের ধ্বনিগত সামঞ্জস্য থাকায় ‘বাংলা’ শব্দের উৎপত্তি এ শব্দ দুটোর মধ্যে নিহিত ছিল বলে ধরে নেয়া যায়। এ বাংলা শব্দের সাথে দেশ শব্দ যুক্ত হয়ে বাংলাদেশ হয়েছে।

রমেশচন্দ্র মজুমদারের মতে খ্রিষ্টীয় পঞ্চদশ শতাব্দী পর্যন্ত বাঙ্গালা একটি স্বতন্ত্র দেশ হিসেবে স্বীকৃত ছিল। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে এ মতও প্রকাশ করেন যে, চতুর্দশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত বাঙ্গালাহ শুধু একটি ভৌগোলিক অঞ্চলই নয় বেঙ্গল যুক্ত প্রদেশ হিসেবে বঙ্গ ও বঙ্গাল একত্রে পরিচিত হতো।

বাংলাদেশ মূলত ভৌগোলিক অঞ্চল হিসেবে পরিচিত হলেও ভাষাতত্ত্বের সাথে এর বিশেষ কোনো সম্পর্ক নেই। সুকুমার সেনের মতে, কৌটিল্যের ‘অর্থশাস্ত্র ই প্রথম গ্রন্থ যেখানে বঙ্গকে একটি ভৌগোলিক অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ গ্রন্থে বঙ্গের সুতিবস্ত্রের কথা বলতে গিয়ে বলা হয়েছে— ‘বঙ্গকং শ্বেতং দুকুলম্’ অর্থাৎ বঙ্গের সাদা ও নরম বস্ত্র হলো অতি উচ্চমানের (৩৯)।

প্রাচীনকালে বঙ্গ নামটি সর্বজনবিদিত ছিল। এর কারণ সম্ভবত কার্পাস তুলা ও কার্পাস তুলাশিল্পের সাথে বঙ্গ নামের সম্পর্ক। কার্পাস তুলাগাছ বঙ্গের এক জাতীয় উদ্ভিদ। বঙ্গ শব্দের অর্থ কার্পাস তুলা। কার্পাস সংস্কৃত অভিধানে সমসাময়িক কোনো শব্দ নয়, এ শব্দ বহু প্রাচীন। বঙ্গজাতি কার্পাস তুলা চাষের জন্য সর্বকালে প্রসিদ্ধ ছিল। পতঞ্জলির মহাভাষ্যে (খ্রি. পূর্ব ২য় শতক) বঙ্গ, সূক্ষ্ম, পুন্ড্রের উল্লেখ আছে উপজাতি হিসেবে।

প্রাচীনকাল থেকে বঙ্গে কার্পাস তুলার প্রাচুর্য্য ছিল বলে কার্পাস তুলা দিয়ে উৎপন্ন অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠানও এ অঞ্চলে গড়ে উঠেছিল (৪০)। সুকুমার সেনের মতে, অতীতকাল হতে এ অঞ্চলে কার্পাস তুলার চাষাবাদ হওয়াতে এ অঞ্চলে বয়নশিল্পেরও প্রসার ঘটে। বৃহত্তর ঢাকা জেলার কাপাসিয়া পুলিশ – স্টেশন এলাকায় সুদূর অতীত কাল হতেই কার্পাস তুলার চাষ হত। ফলে এ অঞ্চলে বয়নশিল্পেরও প্রসার ঘটেছিল। বর্তমানে ঢাকার কাপাসিয়া নাম এই যুক্তিকে সমর্থন করে।

এ তুলা তখন বিদেশ রপ্তানি করা হত। এভাবেই বাংলাদেশের সঙ্গে বহির্বিশ্বের বাণিজ্য সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। সুকুমার সেনের মতে, যেখানে কার্পাস তুলার প্রাচুর্য থাকায় সে অঞ্চলটি বঙ্গ(৪১)। বঙ্গজাতি বলতে সম্ভবত বং বা বঙ গোষ্ঠীর জনগণকে বোঝাত। কারণ বঙ গোষ্ঠীর মানুষের বাসভূমি ছিল ভাগীরথী নদীর পূর্ব তীর থেকে আসামের পশ্চিম অঞ্চল পর্যন্ত। তাই অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন, বঙ শব্দ থেকে বঙ্গ শব্দের উৎপত্তি হয়েছে (৪২)।

আবার আবহমানকাল ধরে অস্ট্রিক, দ্রাবিড় ও ভোটচীন ভাষাভাষী গোষ্ঠী অভিবাসী হিসেবে বাংলায় এবং এ উপমহাদেশের অন্যান্য স্থানে বসতি স্থাপন করতে থাকে। রংপুর, ময়মনসিংহ, কোচবিহার এবং সিলেটের একটি উপজাতি হলো মোচ৷ মোচ ব্রহ্মতিব্বতীয় ভাষাভাষীদের একটি উপশাখা। তবে ভাষাগতভাবে ভোটচীন ভাষাভাষীদের মতো।

এই উপজাতি গোষ্ঠী সচরাচর বোদো নামে পরিচিত। এ ছাড়া কোচ, কোচারী, গারো, রাভ, ত্রিপুরী, দিমাশা, চুটিয়া, লালুং হাজং, রাজবংশী এবং মুরুং প্রভৃতি মোচ বা বোদো উপজাতির অন্তর্ভুক্ত। মোচ ও বোদোরা একে অপরের ভাষা জানে ও বোঝে । পণ্ডিতদের ধারণা, বর্তমান বাংলাভাষা বাক্যরীতি ও উচ্চারণে মোচ ভাষার সাথে সাযুজ্যপূর্ণ (৪৩)।

দিমাশা ভাষাভাষীরা বং শব্দ ব্যবহার করত নিচু (খাড়ি) স্যাতস্যাতে ভূমি এবং যে সমস্ত পাখি স্যাতস্যাতে জায়গা থেকে মাছ শিকার করে খায় তাদের বোঝানোর জন্য৷ যেমন বক, এদের বোঝানোর জন্য বহু প্রাচীনকাল থেকেই বাংলাদেশের পূর্ব এবং দক্ষিণাংশ নিচুভূমি দ্বারা বেষ্টিত ছিল।

ফলে এ অঞ্চলের নদী ও খাড়ি অর্থাৎ খাল-বিল এমনকি স্যাতস্যাতে জায়গাও মাছে পূর্ণ থাকত। ফলে এখনও বলা হয় মাছে-ভাতে বাঙালি। কিন্তু রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক পরিবর্তনের ফলে এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে বর্তমানে এর বিপরীত দৃশ্য দেখা যায়। মাছে-ভাতে বাঙালি এখন শুধু প্রবাদবাক্য মাত্র।

প্রাচীনকালে এ সমস্ত নদী ও খালবিলে প্রচুর সংখ্যক বক ও ঐ ধরনের মৎস্যাহারী পাখি বিচরণ করত এবং পাখির কলকাকলীতে এ অঞ্চল মুখরিত থাকত (৪৪)। তাই বৈদিক আর্যরা বাংলা ভাষাভাষী মানুষের ভাষাকে পাখির ভাষার সাথে তুলনা করে এ ভাষাকে দুর্বোধ্য হিসেবে অভিহিত করেছে।

আসামের উত্তর-পূর্ব পার্বত্যাঞ্চলে মোঙ্গোলীয় রক্তরাধার প্রভাব লক্ষ করা যায়। এরা দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে ক্রমশ ব্রহ্মদেশ, মালয় উপদ্বীপ ও দক্ষিণ-পূর্ব সমুদ্রোপকূলীয় দেশ ও দ্বীপে ছড়িয়ে পড়েছিল। উত্তর-পূর্ব আসাম এবং উত্তর ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় মিরি, নাগা, বোদো, মোচ, কোচ, পালিয়া রাজবংশী প্রভৃতি লোকদের ভেতর মোঙ্গোলীয় রক্তের প্রভাব লক্ষ করা যায়। তবে আসামের উচ্চবর্ণের মানুষ এ রক্তধারার ছিল না।

ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা অধিকৃত ধারা একটি প্রবাহ বাংলাদেশে প্রবেশ করে রংপুর, ময়মনসিংহ, কোচবিহার এবং সিলেটের কিছু অঞ্চলে বসবাস করত। তাই বাংলাদেশের এ অঞ্চলের সমাজের নিম্নস্তরে এ রক্তধারার প্রভাব লক্ষ করা যায়। বাংলাদেশের অন্য কোথাও এ রক্তধারার প্রভাব লক্ষ করা যায় না। তবে উপরের আলোচনা থেকে অনুমান করা যায় মোচ ব্রহ্মতিব্বতীয় ভাষাতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর উপশাখা হলেও বাংলা ভাষার সাথে মোচভাষার সাদৃশ্য রয়েছে (৪৫)।

বাংলা শব্দটি রূপান্তর হয়েছে বঙ্গালের প্রথম ও শেষ ব্যঞ্জনবর্ণের সাথে আ-কার যুক্ত হয়ে এবং মধ্যখানের ব্যঞ্জনবর্ণ থেকে আ-কার বর্জন করে। ডি.সি. সরকারের মতে ভারতীয় উপমহাদেশের অবাঙালি ভাষাভাষীরা বাঙ্গালার শেষ আ-কার বাদ দিয়ে বাঙ্গাল হিসেবে অভিহিত করে, যা আধুনিক হিন্দি শব্দের অপভ্রংশ হিসেবে বিবেচিত হয়।

মুসলমানরা ভারতবর্ষে পদার্পণের পর বঙ্গালকে বাঙ্গালাহ উচ্চারণের জন্য যে অ-বর্ণের উচ্চারণ করত তা ছিল উত্তর ভারতের আঞ্চলিক ভাষার রূপ। মুসলমানরা বাঙ্গালা শব্দটি বঙ্গ ও বঙ্গাল উভয় অঞ্চলের উচ্চারণে ব্যবহার করত। বহিরাগতদের উচ্চারণে বাঙ্গালার প্রথম ও শেষ ব্যঞ্জনবর্ণের সাথে আ-কার যুক্ত হত ঐ অঞ্চলের জনগণকে বোঝানোর জন্য। বাংলার অধিবাসীরা উপমহাদেশের অন্যত্র বাঙালি হিসেবে পরিচিত হত।

ইংরেজিতে বেঙ্গলি হিসেবে পরিচিত হত। ডি.সি. সরকার এ বিষয়টি বিশ্লেষণ করেছেন বাংলা ‘খাজনা’ শব্দটি উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করে। খাজনা শব্দটির উদ্ভব হয়েছে পারস্য শব্দ খাজানাহ্ থেকে। খাজানাহ্ বিবর্তিত হয়ে বাংলায় খাজনা শব্দটি এসেছে। ইতোপূর্বে উল্লেখিত বাঙ্গালা থেকে যেমন মধ্যখানের আ-প্রত্যয় বর্জিত হয়ে বাংলা শব্দটি এসেছে, একইভাবে খাজানার মধ্য আ-কার বর্জিত হয়ে খাজনা শব্দ বিবর্তিত হয়েছে (৪৬)।

বঙ্গের বহিরাগতরা শব্দের শেষে ‘হ’ বর্ণ উচ্চারণ করত শব্দে জোর দেওয়ার জন্য। বাংলার সাথে জনপদ অর্থাৎ দেশ শব্দটি ইংরেজি country বা অঞ্চল হিসেবে পরিগণিত হয়ে বাংলার শেষে যুক্ত হয়েছে। এভাবেই বাংলাদেশ শব্দের উৎপত্তি হয়েছে। এর অর্থ বাংলা নামের একটি দেশ অর্থাৎ বাংলাদেশ।

উপযুক্ত আলোচনা থেকে বোঝা যায় বং, বঙ্গ, বঙ্গাল, বাঙ্গালাহ ইত্যাদি শব্দ থেকে নানা পরিবর্তনের মাধ্যমে বাংলাদেশ নামের উৎপত্তি হয়েছে। এ নামের উৎপত্তির যেমন বহু ইতিহাস রয়েছে, তেমনি বাংলাদেশের ভূখণ্ডকে বহিঃশাসন মুক্ত করে স্বাধীন সার্বভৌম ভূখণ্ডে পরিণত করতেও বহু ইতিহাসের জন্ম হয়েছে।

কারণ উপরের আলোচনা থেকে বোঝা যায় বহিঃশাসক দ্বারা এ দেশের নাম বহুবার পরিবর্তিত হয়েছে। অবশেষে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ নাম অর্জিত হয়। সেই ইতিহাসের আলোকপাত না করলে বাংলাদেশ নামের উৎপত্তির ইতিহাস পূর্ণাঙ্গ হবে না।

খ্রিষ্টপূর্ব সময়ের আদি পর্বে এ ভূখণ্ডে আর্য জাতি প্রভাব বিস্তার করে। এরপর থিক, শক, পঢ়ুব, কুষান প্রভৃতি জাতির আক্রমণে পড়ে আর্যাবর্তে বহু খণ্ড রাজ্যের উদ্ভব হয়। এরপরে মৌর্য বংশ, গুপ্ত বংশ, বাঙালি নরপতি শশাঙ্ক, পাল বংশ, বর্ম বংশ, চন্দ্র বংশ, দেব বংশ, সেন বংশ প্রভৃতি রাজবংশ বাংলায় শাসনকার্য পরিচালনা করতেন।

প্রাচীনকালের শেষ পর্যায়ে বাংলার শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিল সেন বংশ। সেন বংশীয় নরপতি লক্ষ্মণ সেনকে পরাজিত করে খ্রিষ্টীয় ত্রয়োদশ শতকের প্রারম্ভে তুর্কি বীর মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজি সেন শাসনের অবসান ঘটিয়ে বাংলায় মুসলিম শাসনের ভিত্তি স্থাপন করেন।

বঙ্গে খলজির শাসন প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে মুসলিম শাসনের সূচনা হয়। তুর্কী শাসনের অবসানে সুলতানি শাসনের সূচনা হয়। সুলতানি শাসকদের মধ্যে সুলতান ফকরুদ্দীন মোবারক শাহ (১৩৩৮ খ্রি.-১৩৪৯ খ্রি.) সোনারগাঁয়ে স্বাধীন সুলতানি পর্বের সূচনা করেন। আলাউদ্দীন আলী শাহ ফকরুদ্দীনের পদাঙ্ক অনুসরণ করে লখনৌতিতে স্বাধীনতার ভিত্তি দৃঢ় করেন।

পরবর্তীকালে শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ (১৩৩৯ খ্রি.- ১৩৫৮ খ্রি.) সর্বপ্রথম সমগ্র বাংলাদেশকে একত্রিত করে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে সুলতানি পর্ব সুপ্রতিষ্ঠিত করেন। তিনি ‘শাহ-ই-বাঙ্গালা’, ‘শাহ-ই-বাঙালিয়ান’ বা ‘সুলতান-ই বাঙ্গালা’ আখ্যায় আখায়িত হয়েছিলেন। তিনি বর্তমান বাংলাদেশের সমগ্র ভূখণ্ডের নামকরণ করেন ‘শাহী-বাঙ্গালা’।

১৩৪৬ খ্রিষ্টাব্দে সাতগাঁও টাকশাল থেকে ইলিয়াস শাহ মুদ্রিত মুদ্রার প্রাপ্তি তাঁর রাজ্যসীমা সাতগাঁও পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল বলে প্রমাণিত হয়। ১৩৫২ খ্রিষ্টাব্দে ইলিয়াস শাহ পূর্ব বাংলা জয় করেন (৪৭) খিলজির বাংলা সিংহাসনে আরোহণের পর থেকে সুলতানি শাসনের প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত বাংলা কখনো স্বাধীন ছিল আবার কখনো দিল্লির প্রদেশে পরিণত হয়েছিল।

এরপর ক্রমান্বয়ে বাংলায় হাবসী, আফগান শাসন, মোগল শাসন, শায়েস্তা খান, মুর্শীদ কুলী খান, নবাব সুজাউদ্দীন খান, সরফরাজ খান, নবাব আলীবর্দী খান, নবাব সিরাজউদ্দৌলার শাসন অব্যাহত ছিল। মোগল শাসনকালেই বাংলায় পর্তুগীজ, ওলন্দাজ ও ইংরেজ এ তিনটি বিদেশি বণিকের আবির্ভাব হয়। এ তিন বণিক সম্প্রদায় ছাড়াও ফরাসি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, দিনেমার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

 

নবাব আলীবর্দীর শাসনকালেও ইংরেজ বণিকরা বাংলায় ক্ষমতা বিস্তারের ব্যর্থ চেষ্টা করেছিল। কিন্তু আলীবর্দীর মৃত্যুর পর তাঁর মনোনীত দৌহিত্র সিরাজউদ্দৌলার শাসনকালে এ দেশীয় দালালদের সহায়তায় ইংরেজ বণিকরা ষড়যন্ত্র করে পলাশির যুদ্ধের মাধ্যমে তাঁকে সিংহাসনচ্যুত করে। তারপর এদেশীয়রা নামে মাত্র নবাব হলেও ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত ছিল ইংরেজ বণিকদের হাতে।

সিরাজউদ্দৌলার শাসন অবসানের সঙ্গে সঙ্গে বাংলায় বিদেশি শাসনের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৭৬৫ খ্রিষ্টাব্দে রবার্ট ক্লাইভের গভর্নর নিযুক্তির মাধ্যমে এদেশে ইংরেজ শাসনের ভিত্তি দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং তা ধারাবাহিকভাবে চলে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্টের পূর্ব পর্যন্ত প্রায় ২০০ বৎসর কালব্যাপী।

ইংরেজ শাসনের ফলে বাংলাদেশে কৃষ্টি, সংস্কৃতি, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও শিক্ষাব্যবস্থায় অবক্ষয় দেখা দেয়। বাংলার সামগ্রিক অবস্থা অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়ে যায়। এই অন্ধকারে আলোকবর্তিকা নিয়ে এসেছিলেন দুজন মনীষী। তাঁদের একজন রাজা রামমোহন রায়, অপরজন হাজী শরীয়তউল্লাহ ফরায়েজী।

রাজা রামমোহন রায় ধর্ম সংস্কার, সামাজিক সংস্কার, শিক্ষা সংস্কার, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, কৃষকদের অবস্থার উন্নয়ন, এ দেশীয় জনগণের মধ্যে জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটানো ইত্যাদি বিষয়ে ব্রতী ছিলেন। অপর দিকে হাজী শরীয়তউল্লাহ তখন পূর্ব বাংলার মুসলমান সমাজ, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সংস্কার আন্দোলন শুরু করেন। তাঁর এই আন্দোলন ফরায়েজী আন্দোলন নামে পরিচিত ছিল।

এভাবে তাঁরা সংস্কার আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলার মানুষকে অন্যায় অবিচার প্রতিরোধের জন্য পুনর্জাগরণে আত্মনিয়োগ করেছেন। ফরায়েজীর মতো তিতুমীরও পশ্চিমবঙ্গে প্রজা আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। বাংলার কৃষক, তাঁতি সকলে এ আন্দোলনে যোগ দিয়েছিল জমিদার ও নীলকরদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে। তিতুমীরের প্রজা আন্দোলন ব্যর্থ হলেও পরবর্তীকালে এ আন্দোলন স্বাধীনতাসংগ্রামে প্রেরণা জুগিয়েছিল।

প্রশাসনিক সুবিধার জন্য ১৮৫৩ সালে স্যার চার্লস গ্রান্ট ও ১৮৫৪ সালে লর্ড ডালহৌসী বোম্বাই ও মাদ্রাজ প্রদেশের মতো বাংলা বিভক্তির সুপারিশ করেন (৪৮)। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ এ যুক্তির পরিপ্রেক্ষিতে ১৮৫৪ সালে বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা ও আসাম নিয়ে বঙ্গ দেশ বা বাংলা প্রদেশ বা বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি নামে স্বতন্ত্র প্রদেশ গঠন করে। এ প্রদেশে লোকসংখ্যা ছিল সমগ্র উপমহাদেশের এক তৃতীয়াংশ।

অতিরিক্ত লোকসংখ্যা ও বিশাল আয়তনের এ প্রদেশের প্রশাসনিক কাজে নানা অসুবিধার কারণে বাংলার লেফটেন্যান্ট গভর্নর স্যার উইলিয়ামের সুপারিশে ১৮৭৪ সালে সিলেট, গোয়ালপাড়া ও কাছার প্রভৃতি বাংলা ভাষাভাষী জেলাগুলো আসামের অন্তর্ভুক্ত করে আসামকে আলাদা করা হয়। এই বিচ্ছিন্নকৃত আসামের প্রশাসনিক দায়িত্ব একজন কমিশনারের হাতে অর্পণ করা হয়।

মূলত এই বিচ্ছিন্নকরণ ছিল বঙ্গভঙ্গের প্রথম পদক্ষেপ। ১৮৯২ সালে প্রশাসনিক ও সামরিক গুরুত্ব বিবেচনা করে লুসাই পাহাড় আসামের অন্তর্ভুক্ত করা হয় (৪৯)।

বাংলা প্রেসিডেন্থি থেকে আসামকে বিচ্ছিন্ন করা হলেও আসাম এবং বাংলা প্রেসিডেন্সির নতুন প্রশাসনের আওতায় নতুন নতুন সমস্যার সৃষ্টি হয়েছিল। তাই ১৮৯৬ সালে আসামের চীফ কমিশন স্যার উইলিয়াম ওয়ার্ড বাংলা প্রদেশ থেকে ঢাকা, ময়মনসিংহ ও চট্টগ্রামকে বিচ্ছিন্ন করে আসামের সঙ্গে যুক্ত করে আসামের আয়তন বৃদ্ধির সুপারিশ করেন। কিন্তু বাংলার জনগণ এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করায় কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যায়।

১৮৯৮ সালে লর্ড কার্জন ভারতের বড় লাট নিযুক্ত হয়ে শাসনকার্যের শুরুতেই এত বিশাল আয়তনের বাংলা প্রদেশকে একটি মাত্র প্রশাসনের অধীনে রাখা সমীচীন মনে করেন না। সুদূর কলিকাতা থেকে পূর্বাঞ্চলের প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করা কষ্টসাধ্য। এতে জনগণও ন্যায্য প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হয় বলে তিনি বাংলা প্রদেশকে দুভাগে বিভক্ত করার পক্ষে মত প্রদান করেছিলেন।

প্রশাসনিক সুবিধার জন্য উত্তর ও পূর্ব বাংলাকে আসামের সঙ্গে যুক্ত করে পূর্ব বাংলা ও আসাম প্রদেশ গঠিত হয়েছিল। অপরদিকে পশ্চিম বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার সমন্বয়ে নবগঠিত অপর প্রদেশের নাম হয় বাংলা প্রদেশ। ১৯০৫ সালের ১০ জুলাই ভারত সচিব ব্রডারিক বঙ্গভঙ্গের অনুমোদন প্রদান করে গেজেট প্রকাশ করেন (৫০)।

বঙ্গভঙ্গের প্রস্তাবে হিন্দুরা প্রথম থেকেই তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে। প্রথম দিকে মুসলমানরা বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করলেও ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক মুসলমানদের জন্য পূর্ণাঙ্গ প্রদেশ গঠনের ঘোষণা দেওয়ায় মুসলমানরা তাদের সার্বিক উন্নতির সূচনা হবে এবং ঢাকায় রাজধানী হবে ও ঢাকার গৌরব ফিরে পাবে বিবেচনা করে তারা বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন থেকে সরে আসে। বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলন ক্রমে তীব্র হয়।

১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দের ৩০ ডিসেম্বর নবাব সলিমুল্লাহর উদ্যোগে যে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয় তা বঙ্গভঙ্গকে সমর্থন জানিয়ে এর বিরোধীদের কার্যকলাপের নিন্দা জানায়। এর ফলে হিন্দু-মুসলমান পরস্পর বিরোধী অবস্থানের কারণে দাঙ্গা শুরু হয়। ক্রমে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন স্বদেশি আন্দোলনে রূপ নেয়।

এ আন্দোলনে সকল পেশাজীবী এবং ছাত্রজনতা ঐক্যবদ্ধ হয়। ফলে আন্দোলন বেগবান হয়। আন্দোলন ক্রমশ তীব্র হলে ১৯১১ সালের ১২ ডিসেম্বর সম্রাট পঞ্চম জর্জ ঐতিহাসিক দিল্লী দরবারে বঙ্গভঙ্গ রদের ঘোষণা দেন। এ ঘোষণা কার্যকর হয় ১৯১২ সালের জানুয়ারি থেকে (৫১)।

ইতোমধ্যে ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়। বিশ্বযুদ্ধে তুরস্ক-জার্মান ঐক্য উপমহাদেশের মুসলমানদের ভাবিয়ে তোলে। কারণ ইসলামের অধিকর্তা তুরস্কের খলিফার সাম্রাজ্য ব্যবচ্ছেদ নীতির সমর্থনে খিলাফত কমিটি গঠিত হয়েছিল। তুরস্কের খলিফা ছিলেন উপমহাদেশের মুসলমানদের নিকট ধর্মীয় নেতা হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার কৌশলে এ পরিস্থিতির মোকাবেলা করে। ব্রিটিশ সরকারের নমনীয় মনোভাবের ফলে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ নেতাদের সমঝোতার মনোভাব তৈরি হয়।

তখন জাতীয়তাবাদী ও উদারনৈতিক নেতাদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় হিন্দু-মুসলমান ঐক্য ও সহযোগিতার উপর জোর দেওয়া হয়। ঐক্য প্রতিষ্ঠার অগ্রণী ভূমিকায় ছিলেন কংগ্রেসের সভাপতি এস.পি. সিংহ ও মুসলিম লীগের সভাপতি মাজহারুল হক। ১৯১৬ সালের ডিসেম্বরে কংগ্রেস ও লীগ উভয়ের মধ্যে গ্রহণযোগ্য শাসনতান্ত্রিক পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য লাহোরে একটি সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এটি ঐতিহাসিক ‘লক্ষ্মৌ চুক্তি’ নামে খ্যাত (৫২)।

১৯১৮ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অবসান হয়। এ যুদ্ধের ফলে উপমহাদেশের রাজনীতিতে দ্রুত পরিবর্তন আসতে থাকে। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তদের জীবনে অর্থনৈতিক বিপর্যয় দেখা দেয়। গভর্নরের ক্ষমতা থেকে ভারতকে মুক্ত করার জন্য কিছু ভারতীয় যুবক জার্মানির সহযোগিতায় স্বাধিকার অর্জনের চেষ্টা করে। কিন্তু বড় লাট নির্যাতন দমনমূলক ‘রাওলাট’ আইন পাস করে উপমহাদেশে হত্যাযজ্ঞ শুরু করে।

ব্রিটিশ অত্যাচার-নির্যাতনের প্রতিবাদে সারা দেশে গান্ধীর নেতৃত্বে অসহযোগ আন্দোলন ও ফজলুল হকের নেতৃত্বে খিলাফত আন্দোলন শুরু হয়। এরপর ১৯২২ সালে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ ও মতিলাল নেহেরু একযোগে স্বরাজ পার্টি গঠন করেন। সুভাষ বসু, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীসহ অনেকেই এ পার্টির সদস্য হন। এ পার্টির মাধ্যমে হিন্দু মুসলমানদের মধ্যে ঐক্যের চেষ্টা করা হলেও তা ব্যর্থ হয়। এর ফলে উভয়ের রাজনীতি ক্রমশ স্বতন্ত্র ধারায় অগ্রসর হয়।

ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নানা উত্থান পতনের মাধ্যমে ক্রমে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন তীব্র হয়। বিশেষ করে ১৯৩৭ থেকে ১৯৪৭ সাল এ ১০ বৎসর আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে। এর ফলে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়।

ভারত বিভক্তির সময়ই মূলত বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের বীজ বপন হয়। কারণ ভারত বিভক্তির সময় অখণ্ড বাংলাকে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে গঠনের সুযোগ থাকলেও কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের উচ্চ পর্যায়ের নেতাদের বাংলাকে শোষণ করার চক্রান্তে অখণ্ড বাংলা গঠনের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।

 

স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস - জাতীয় স্মৃতিসৌধ বাংলার স্বাধীনতার প্রতীক
স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস – জাতীয় স্মৃতিসৌধ বাংলার স্বাধীনতার প্রতীক

 

কংগ্রেস ও লীগ নেতাদের প্রচেষ্টায় অখণ্ড বাংলাকে ধর্মীয় ভিত্তিতে দুভাগে বিভক্ত করা হয়। হিন্দু প্রধান পশ্চিম বাংলা ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং মুসলিম প্রধান পূর্ব বাংলা পাকিস্তানের সাথে যুক্ত হয় (৫৩)।

১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর বিতর্কিত দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে জন্ম হয় পাকিস্তান রাষ্ট্রের। ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবে ভারত বিভক্তির যে খসড়া প্রস্তুত হয়েছিল তাতে ভারতের উত্তর, পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল নিয়ে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব ছিল।

ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দিক বিবেচনা করেই লাহোর প্রস্তাবে দুটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠনের পরিকল্পনা গৃহীত হয়েছিল। কিন্তু ১৯৪৪ সালে জিন্নাহ প্রথম ঘোষণা করেন, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলো নিয়ে স্বাধীন সার্বভৌম একটি মুসলিম রাষ্ট্র গঠন করা হবে।

এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৪৬ সালে লাহোর প্রস্তাব সংশোধন করে States স্থলে State করে এককেন্দ্রিক পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের কাঠামো তৈরি করা হয়। এ কাঠামোর ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট বহু পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও দুটি ভূখণ্ড নিয়ে ‘পাকিস্তান’ রাষ্ট্রের জন্ম হয় (৫৪)।

দুই ভূখণ্ড নিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের পর থেকেই পাকিস্তানি শাসকচক্র পূর্ব বাংলার জনগণকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক দিক থেকে বঞ্চিত করে। দুই ভূখণ্ডের ভৌগোলিক পরিবেশ, ভাষা, সংস্কৃতি, আচার-ব্যবহার, ঐতিহ্য পরস্পর থেকে ছিল সম্পূর্ণ পৃথক। একমাত্র ধর্ম ছাড়া আর কোনো বিষয়ে দুই ভূখণ্ডের মৌলিক কোনো ঐক্য ছিল না।

অবশ্য লাহোর প্রস্তাব অনুসারে পাকিস্তান সৃষ্টি না হওয়ায় তখন থেকেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মনে পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে প্রশ্ন জাগতে থাকে। অধ্যাপক সালাহ্উদ্দীন আহ্মদ যথার্থই বলেছেন, ‘মুসলিম লীগের অবাঙালি নেতাদের বাঙালিবিরোধী চক্রান্ত সম্পর্কে শেখ সাহেব সজাগ হতে শুরু করেছিলেন। ফলে ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানি শাসকদের শাসন, শোষণ, অত্যাচার, নির্যাতন, বঞ্চনার বিরুদ্ধে এদেশের মানুষ সংগ্রামী ভূমিকা পালন করে।

 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান [ Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman ] তাজউদ্দীন আহমদ [ Tajuddin Ahmed ]
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান [ Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman ] তাজউদ্দীন আহমদ [ Tajuddin Ahmed ]

 

একাত্তরের দীর্ঘ নয় মাস বাঙালি জাতীয়তাবাদের আলোর দিশারী হয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে এবং লাখো মানুষের জীবনের বিনিময়ে ও বহু মানুষের চরম ত্যাগ তিতীক্ষায় রচিত হয় এক গৌরবদীপ্ত ইতিহাস আমাদের মুক্তিযুদ্ধ।

খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকেরও পূর্ব থেকে বিভিন্ন সময় এই ভূখণ্ড বিভিন্ন নামে পরিচিত ছিল। প্রাচীনকালে বঙ্গ, বঙ্গাল, মধ্যযুগে বাঙ্গালাহ্, বেঙ্গালাহ, সুবে বাঙ্গালাহ, শাহীবাংলা, পাকিস্তান শাসন আমলে পূর্ব বাংলা ও পূর্ব পাকিস্তান। ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত সময়কাল এই ভূখণ্ডের নাম ছিল পূর্ব বাংলা। ১৯৫৫ সালে এর নাম হয় পূর্ব পাকিস্তান। মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পৃথিবীর মানচিত্রে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে এই ভূখণ্ডের নাম হয় বাংলাদেশ।

আরও পড়ুন:


তথ্যনির্দেশ :

১. প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন : উয়ারী-বটেশ্বর, মুহাম্মদ হাবিবুল্লা পাঠান, ঢাকা, ১৯৮৯, পৃ. ১০-১৩
২. J. Coggin, Catalogue of Pre-historic Antiquities in the Indian Museum, (CPAIM) Calcutta, 1917, p.130; A.H. Dani, Prehistory and Protohistory of Eastern India, (এরপর থেকে PPEI) Calcutta, 1960, p. 67, fin. 1
৩. শ্রী সুকুমার সেন, বঙ্গভূমিকা (বঙ্গভূমিকা), কলিকাতা, ১৯৭৪ পৃ. ৪-৫

৪. লখনৌতি অঞ্চল প্রাচীনকালে লক্ষ্মণাবতী নামে পরিচিত ছিল। সম্ভবত লক্ষ্মণ সেনের নামানুসারেই এ নগরীর এ নামকরণ করা হয়েছিল। প্রাচীন গৌড় অভিহিত করা হয়েছিল। মুসলিম ঐতিহাসিকদের উচ্চারণে লক্ষ্মণাবতী লখনৌতি হয়।

৫. সাতগা বা সপ্তগ্রাম নামের মূল শব্দ সম্ভবত সার্থগ্রাম। কারণ প্রাচীনকালে হাট-পত্তনের নাম ছিল সার্থগ্রাম অর্থাৎ যে গ্রামে দল বেঁধে জলপথে ও স্থলপথে পণ্যদ্রব্য নিয়ে বণিকেরা আসত। যেহেতু এ স্থানে বন্দর ছিল, সেহেতু এখানে হাট পত্তন ছিল। তাই সার্থগ্রাম নাম হওয়া যুক্তিযুক্ত হয়েছে

৬. ঐতিহাসিকদের অনুমান এ নগর গঙ্গার তীরে অবস্থিত। লোকশ্রুতি আছে এ নদীর বালি থেকে সোনা সংগৃহীত হতো বলে এ স্থানের নাম সোনারগাঁও। এছাড়া কলতিস নামক সোনার মোহরের মাধ্যমে এখানে বাণিজ্য চলতো বলে এ স্থানের নাম সোনারগাও
৭. Sir Jadunath Sarkar Commemoration Volume, (JSCV), Lahore, 1958, pp. 54-56
৮. H.G. Reverty (Tr.), Tabaqat-i-Nasiri, reprinted, New Delhi, 1970, p. 558
৯. JSCV, p.54

১০. Ibid. p. 54
১১. lbid. p. 54-55

১২. Ibid. p. 55
১৩. Epigraphia India (এরপর থেকে EI) vol XX.pp.22-23

১৪ J.F. Fleet (ed.) Corpus Inscriptionum Indicarum, Vol. III, (এরপর থেকে CII), Calcutta, 1888,p.141
১৫. R.C. Majumdar (ed). History of Bengal, vol. I এরপর থেকে HB-1), Dacca, 1943. p.20.

১৬. Ibid, p. 23
১৭. El XVIII, pp.74

১৮. নীহাররঞ্জন রায়, ‘বাঙ্গালীর ইতিহাস’ (এরপর বা ই-রায়), আদিপর্ব, কলিকাতা, ১৯৮০, ৩য় সংস্করণ, পৃ. ১৩০

১৯. Indian Antiquary (এরপর থেকে IA) Vol. XXXIX, p. 193

২০. N.G. Majumdar (ed) Inscriptions of Bengal. Vol. III. (এরপর থেকে IB-III) Rajshahi 1929. pp. 140
২১. Indian Historical Quarterly. (এরপর থেকে IHQ) vol. XVI, p.237

২২. R.C. Majumdar History of Ancient Bengal (এরপর থেকে HAB), Calcutta, 1974, pp. 167
২৩. Bangladesh Lalitkala, Journal of the Dacca Museum, Vol.I (এরপর থেকে BLK) p. 50
২৪. XXXIV, pp. 12317 & pp.
২৫. HBA, p. 133)
২৬. EIV.pp.57,IX,p.229

২৭. Ibid, p. 257
২৮. Kamalakanata Gupta (ed). Copper Plates of Sylhet (এরপর থেকে CPS). Sylhet. 1967p. 98. L. 42
২৯. 1B. III. p. 140
৩০. Ain-i-Akbari p. 120

৩১. D.C. Sircar, Studies in the Geography of Ancient and medieval india (এরপর থেকে SGAMI), Delhi, 1960, p. 132

৩২. lbid, p. 125
৩৩. IHQ.. p. 237, HB 1. p. 19

৩৪. HAB. p. 11
৩৫. THO. vol. i, pp. 237-38

৩৬. বা.ই-রায়, পৃ. ১১০
39. HB-1.p. 15

৩৮. IHQ. voi.1, p. 236
৩৯. R.P.Kangle, The Kautiliya Arthasastra, part 1, Bombay, 1960-II 11

৪০. বঙ্গভূমিকা, পৃ. ৭-৮

৪১. lbid. p. 15.
৪২. কে. এম. রাইছউদ্দিন খান, বাংলাদেশের ইতিহাস পরিক্রমা (এরপর থেকে বাংলাদেশের ইতিহাস পরিক্রমা),ঢাকা, ১৯৯১, পৃ. ২৩
8৩. Modern Review. 1936, p. 275
88. Weekly Desh, Calcutta, December 25,1982, pp.16-18
৪৫. বা.ই-রায়, পৃ. ৩৪-৩৫
৪৬. D.C. Sircar, Studies in the Geography of Ancient and Medieval India. Delhi, 1960. p. 131.fn. 2

৪৭. ড. আবদুর রহীম, ড. আবদুল মোমিন চৌধুরী, ড. এ.বি.এম. মাহমুদ, ড. সিরাজুল ইসলাম, বাংলাদেশের ইতিহাস, নতুন সংস্করণ, (এরপর থেকে বাংলাদেশের ইতিহাস, নতুন সংস্করণ) ঢাকা, ২০১০, পৃ. ১৯২
৪৮. ঐ, পৃ ৪০২
৪৯. ঐ, পৃ ৪০৩

৪৯. ঐ, পৃ ৪০৩-৪০৫

৫১. ঐ, পৃ ৪০৭

৫১. ঐ, পৃ ৪১৯

৫২. ড. মো. মাহবুবর রহমান, বাংলাদেশের ইতিহাস ১৯৪৭-৭১ (এরপর থেকে বাংলাদেশের ইতিহাস ১৯৪৭-৭১), ২০০৬, ঢাকা, পৃ. ভূমিকা-১

৫৪. বাংলাদেশের ইতিহাস, নতুন সংস্করণ, পৃ. ৪৫3-858

 

আরও দেখুন…

“বাংলাদেশ নামের উৎপত্তি ও তার প্রাসঙ্গিক ইতিহাস – সুপ্তিকণা মজুমদার”-এ 7-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন