১২ এপ্রিল ১৯৭১ | আটকের পর বঙ্গবন্ধুর ছবি প্রকাশ | বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস

১২ এপ্রিল ১৯৭১ | আটকের পর বঙ্গবন্ধুর ছবি প্রকাশ | বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস

 

স্বাধীনতাযুদ্ধে বিজয়ের পেছনে ছিল দেশ-বিদেশের বহু মানুষের একক ও মিলিত চেষ্টা এবং অজস্র ঘটনা। এখানে রইল মুক্তিযুদ্ধের প্রত্তেকটি দিনের বিবরণ।

 

১২ এপ্রিল ১৯৭১

আটকের পর বঙ্গবন্ধুর ছবি প্রকাশ

 

পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে আটক করার পর ১২ এপ্রিল তাঁর ছবি দৈনিক পাকিস্তানসহ কিছু পত্রিকায় ছাপা হয়। দৈনিক পাকিস্তান-এ ক্যাপশন ছিল, ‘আটক অবস্থায় করাচি বিমানবন্দরে শেখ মুজিবুর রহমান’।

বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপতি করে এই দিনে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রীদের নাম ঘোষণা করা হয়। উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানিদের হাতে বন্দী থাকায় রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা, দায়িত্ব
ও কর্তব্য পালনের জন্য উপরাষ্ট্রপতি ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। তাজউদ্দীন আহমদ হন প্রধানমন্ত্রী। এর পাশাপাশি প্রতিরক্ষা, তথ্য, সম্প্রচার ও যোগাযোগ, অর্থনৈতিক বিষয়াবলি, পরিকল্পনা বিভাগ, শিক্ষা, স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্য, শ্রম, সমাজকল্যাণ, সংস্থাপনসহ যেসব মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব কারও ওপর অর্পিত হয়নি, তাঁরও দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী তিনি। একই সঙ্গে তিনি মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা ও সমন্বয় সাধন করবেন।

মন্ত্রিসভার অপর সদস্যরা হলেন খন্দকার মোশতাক আহমদ (পররাষ্ট্র, আইন ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়), ক্যাপ্টেন (অব.) এম মনসুর আলী (অর্থ, শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়) এবং এ এইচ এম কামারুজ্জামান (স্বরাষ্ট্র, সরবরাহ, ত্রাণ ও পুনর্বাসন এবং কৃষি মন্ত্রণালয়)।

 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান

 

অবরুদ্ধ বাংলাদেশ

মুক্তিযোদ্ধাদের মোকাবিলা করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ঢাকায় মৌলভি ফরিদ আহমেদের নেতৃত্বে শান্তি কমিটির ৯ সদস্যের একটি স্টিয়ারিং কমিটি গঠন করা হয়। ইসলামিক রিপাবলিক পার্টির সভাপতি মাওলানা নুরুজ্জামান কমিটির সাধারণ সম্পাদক এবং ব্যারিস্টার কোরবান আলী, ওয়াজি উল্লাহ খান, আজিজুর রহমান, মোস্তাফিজুর রহমান, অ্যাডভোকেট কাজী ফিরোজ সিদ্দিকী (চট্টগ্রাম), এ কে নুরুল করিম (স্বতন্ত্র সদস্য, প্রাদেশিক পরিষদ) ও মাহমুদ আলী সরকার কমিটির সদস্য মনোনীত হন।

সামরিক কর্তৃপক্ষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাদে বাকি সব সরকারি, স্বশাসিত এবং আধা স্বশাসিত সংস্থার কর্মচারীদের ২১ এপ্রিলের মধ্যে কাজে যোগ দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে বলে, অনুপস্থিত কর্মচারীদের বরখাস্ত করা হবে।

প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতি সামসুল হুদা, সাধারণ সম্পাদক এ এস এম ইউসুফ, সাবেক পার্লামেন্টারি সেক্রেটারি আবদুল আওয়াল এবং মোহাম্মদ হোসেন ঢাকায় গভর্নর লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাঁকে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দেন। জেনারেল ইয়াহিয়ার সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার যুক্তি ব্যাখ্যা করে মুসলিম লীগ নেতা খান এ সবুর খান ঢাকায় এক সভা করেন।

পাকিস্তান সেনাবাহিনী সৈয়দপুর থেকে আটক প্রায় ১৫০ জনকে রংপুর সেনানিবাসের পশ্চিম দিকের উপশহরে নিয়ে গুলি করে হত্যা করে।

 

১২ এপ্রিল ১৯৭১ | আটকের পর বঙ্গবন্ধুর ছবি প্রকাশ | বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস

 

নানা স্থানে লড়াই

এই দিন ভোরে পাকিস্তান সেনাবাহিনী আর্টিলারি দিয়ে যশোরের ঝিকরগাছায় মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থানে হামলা করে। দুই পক্ষে তুমুল যুদ্ধ হয়। ভারতের বিএসএফ এ যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে অংশ নেয়। যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর দুজন এবং বিএসএফের একজন নিহত হন। যুদ্ধ শেষে মুক্তিযোদ্ধারা সীমান্তসংলগ্ন বেনাপোলের কাগজপুকুরে অবস্থান নেন।

দিনাজপুরের পার্বতীপুর ও হাবরায় মুক্তিবাহিনীর অবস্থানে পাকিস্তান সেনাবাহিনী হামলা করে। দুই জায়গাতেই মুক্তিযোদ্ধারা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েন। পার্বতীপুরে একজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ এবং কয়েকজন আহত হন।

তিস্তা সেতুতে মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থানে পাকিস্তান সেনাবাহিনী তিন দিক থেকে আক্রমণ করে। তীব্র আক্রমণের মুখে মুক্তিযোদ্ধারা তিস্তা সেতুর অবস্থান ছেড়ে দিতে বাধ্য হন।

রাজশাহীর সারদা মোড়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধ হয়। নাটোরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রচণ্ড হামলায় মুক্তিযোদ্ধারা পিছু হটে রাজশাহীর বাণেশ্বরে অবস্থান নেন।

মুক্তিবাহিনীর কয়েকটি দল সম্মিলিতভাবে লালমনিরহাট বিমানবন্দরে অবস্থান নেওয়া পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে আক্রমণ করে। পাকিস্তানিদের পাল্টা আক্রমণে মুক্তিযোদ্ধারা পিছু হটে যান। তবে কয়েক ঘণ্টার এই যুদ্ধে পাকিস্তানিদের ক্ষয়ক্ষতি হয়।

যশোর-ঝিনাইদহ সড়কের মিঠাপুকুরিয়ায় অবস্থান নেওয়া ইপিআরের একটি কোম্পানি এবং পুলিশ ও আনসারদের নিয়ে গঠিত মুক্তিবাহিনীর একটি দলের ওপর পাকিস্তানিরা আর্টিলারি দিয়ে আক্রমণ করে। তারা মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান পেরিয়ে এগোতে থাকে। জয় পাকিস্তানিদের পক্ষে গেলেও তাদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।

 

১২ এপ্রিল ১৯৭১ | আটকের পর বঙ্গবন্ধুর ছবি প্রকাশ | বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস

 

বিদেশি সংবাদমাধ্যমে বাংলাদেশ

বাঙালিদের ওপর নির্যাতনের প্রতিবাদে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের কাছে আমেরিকান ফ্রেন্ডস অব পাকিস্তানের পক্ষ থেকে ওয়াশিংটন পোস্ট-এ একটি খোলা চিঠি প্রকাশিত হয়। এতে যুক্তরাষ্ট্রের ২৯ জন বিশিষ্ট নাগরিক স্বাক্ষর করেন। চিঠিতে তাঁরা অবিলম্বে পূর্ব বাংলার সমস্যা সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, বল প্রয়োগ করে মানুষের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার অধিকার কোনো সরকারেরই নেই।

 

History Gurukul [ ইতিহাস গুরুকুল ] GOLN logo
History Gurukul [ ইতিহাস গুরুকুল ] GOLN logo

 

টাইম ম্যাগাজিন-এ ‘প্রথম রাউন্ডে পশ্চিম পাকিস্তানের বিজয়’ শিরোনামে বাংলাদেশ নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। তাতে ঢাকায় নিযুক্ত এক বিদেশি কূটনীতিকের বরাত দিয়ে বলা হয়, পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে। ঢাকার বুকে ট্যাংক চষে বেড়াচ্ছে।

অসংখ্য বাড়ি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। শক্তিশালী পাকিস্তান সেনাবাহিনী এখন অব্দি জয়ী। তবে কিছুদিনের জন্য ঢাকাসহ অন্যান্য শহরে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারলেও ৫৫ হাজার বর্গমাইল গ্রামীণ অঞ্চল এবং বিপুল বিক্ষুব্ধ জনগণকে দীর্ঘস্থায়ী নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রায় অসম্ভব।

 

 

আরও দেখুন…

“১২ এপ্রিল ১৯৭১ | আটকের পর বঙ্গবন্ধুর ছবি প্রকাশ | বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস”-এ 7-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন