ধর্মের উৎপত্তির ইতিহাস (The Advent of Religion)

ধর্মের উৎপত্তির ইতিহাস [ The Advent of Religion ] : মানুষের ইতিহাস হল প্রকৃতপক্ষে ধর্মের ইতিহাস। ম্যাক্সমূলারের (Maxmuller) এই উক্তি দিয়ে শুরু করে মোহাম্মদ আবদুল হাই তার ধর্মের সহজপাঠ গ্রন্থের প্রথম অধ্যায়ে লিখেছেন :

‘মানুষের ইতিহাস হল প্রকৃতপক্ষে ধর্মের ইতিহাস’—মানব সভ্যতার মূলের দিক থেকে বিচার করলে ম্যাক্সমূলারের (Maxmuller) এই উক্তি খুব একটা অতিশয়োক্তিপূর্ণ নয়। কারণ এমন কোন আদিম মানব গোষ্ঠী বা সমাজ ছিল না যেখানে অজ্ঞতা থেকে ধর্মের ধারণা প্রথম সৃষ্টি লাভ করেনি। অবশ্য আজকের সুসংগঠিত, প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মমতের সঙ্গে আদিম ধর্মমতের পার্থক্য ছিল অনেক। ধর্মের প্রথম উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের প্রশ্নটি ঐতিহাসিক ও মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে সতর্কভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।ধর্মের উৎপত্তির ইতিহাস (The Advent of Religion) Sign of Islam

আর তারপরই ধর্মের স্বরূপ ও কার্যাবলি ব্যাখ্যা করা সম্ভব। কেননা ধর্ম একটি অত্যন্ত জটিল বিষয়। একে কোন একটিমাত্র সামাজিক রীতির বৃদ্ধি বা বিস্তৃতির সাহায্যে ব্যাখ্যা করা যায় না। যতই আদিম রূপের হোক না কেন উপাসনাকে কোন একটিমাত্র চিন্তার বা একটিমাত্র আবেগের প্রকাশ বলা যায় না। বরং ধর্ম হল (মানব সভ্যতার ক্রম বিবর্তনশীল ধারার বহু বহু পূর্বের) অনেকগুলো জটিল ও শক্তিশালী চিন্তার সৃষ্টি।

কোন কোন গবেষক মনে করেন, ‘ঈশ্বর মানুষ সৃষ্টি করেছেন’—এই তত্ত্বটির মধ্যেই রয়েছে ধর্মের সবচেয়ে বড় ফাঁকি। আদমের উৎপত্তিকাল থেকে বাইবেলের হিসেব অনুযায়ী আব্রাহাম জন্মগ্রহণ করেছিলেন আদমের ১৯৪৮ বছর পর। এবং আব্রাহামের জন্ম থেকে যিশুর আবির্ভাব ঘটেছিল ১৮৫২ বছর পরে। অর্থাৎ আদম থেকে যিশুর সময়ের ব্যবধান ৩৮০০ বছর। বাইবেলে বিশ্বসৃষ্টির আবির্ভাব হয়েছিল তাও নির্দিষ্টভাবে বলে দেওয়া হয়েছে।

আজকের ২০২১ খ্রিষ্টাব্দকে ভিত্তি হিসেবে আগে (যিশুর জন্মের ৩/৪ বছর পর থেকে খ্রিষ্টীয় সন গণনা শুরু হয়, সেই হিসেবে) বিশ্বসৃষ্টির সূচনা ঘটেছিল। আর মানুষ সৃষ্টি হয়েছিল, অর্থাৎ প্রথম মানব আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছে এর মাত্র দিন কয়েক পরেই। বাইবেলের এই সৃষ্টিতত্ত্বকে ইসলাম সমর্থন করে। কিন্তু এই সৃষ্টিতত্ত্ব আজ বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত নয়।

সকল ধর্ম বিশ্বাসে সৃষ্টিতত্ত্ব :

পুরানো বাইবেল-এ আছে হিব্রুসৃষ্টিতত্ত্ব। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কেননা পৃথিবীর তিনটি প্রধান ধর্ম বিশ্বাস করে এ-সৃষ্টিতত্ত্বে, অর্থাৎ পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ মানে এবং বিভ্রান্ত হয় এটি দিয়ে। বাইবেলের সৃষ্টিতত্ত্ব মৌলিক নয়, এর অনেকখানি ধার করা হয়েছে ব্যাবিলনি সৃষ্টিতত্ত্ব থেকে; এবং এর নানা মিল রয়েছে হিন্দুসৃষ্টিতত্ত্বের সাথেও। বেদের ‘নাসাদীয় সূক্ত এবং ‘হিরণ্যগর্ভ সূক্ত’— দুটিই হিন্দু সৃষ্টিতত্ত্বের সপক্ষে দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থাপিত হয়।

নাসাদীয় সূত্তে বলা হয়েছে, ‘নাসাদাসিস নঃ সদাসিত্ তদানীম নাসিদ রজ ন ব্যামাপ্রো যৎ…। (ঋগ্বেদ, ১০/১২৯/১)। অর্থাৎ সেকালে যা নেই তাও ছিল না, যা আছে তাও ছিল না। পৃথিবী ছিল না, অতি দূরবিস্তৃত আকাশও ছিল না। আবরণ করে এমন কি ছিল? কোথায় কার স্থান ছিল? দুর্গম ও গম্ভীর জল কি তখন ছিল?

আরেকটি সূক্তে আছে, ‘তম অসিৎ তমস…তপসস্তন্মাহিনাজায়াতৈকম (ঋগ্বেদ, ১০/১২৯/৩)। অর্থাৎ চারদিক ছিল অন্ধকারাচ্ছন্ন। সমস্ত জিনিস একত্রে পুঞ্জীভূত ছিল। সেখান থেকে প্রচণ্ড তাপের সৃষ্টি হল।

হিরণ্যগর্ভ সূক্তে বলা হয়েছে, ‘আপন হ য়দ বৃহাতিবিশ্বমা য়ান গর্ভম…।’ (ঋগ্বেদ, ১০/১২১/৭)। অর্থাৎ সর্বপ্রথম হিরণ্যগর্ভই সৃষ্টি হল অর্থাৎ সর্বপ্রথম জলময় প্রাণের উৎপত্তি হয়। এখানে প্রথম প্রাণকে প্রজাপতি (ব্রহ্ম) বলা হয়েছে।

আরেকটি সূক্তে আছে, ‘হিরণ্যগর্ভানি অপঃ তে সলিলা…। ঋগ্বেদ, (১০/৭২/২) অর্থাৎ প্রথমে হিরণ্যগর্ভ সৃষ্ট হল। সেখানে ছিল উত্তপ্ত গলিত তরল। এটি ছিল মহাশূন্যে ভাসমান। বছরের পর বছর এই অবস্থা অতিক্রান্ত হয়। তারপর সেখানে বিস্ফোরণ ঘটল গলিত পদার্থ থেকে, বিন্দু থেকে যেন সব প্রসারিত হতে শুরু হল।… সেই বিস্ফোরিত অংশসমূহ থেকে বিভিন্ন গ্রহ, নক্ষত্র তৈরি হল। (ঋগ্বেদ, ১০/৭২/৩)।

‘তার এক জীবনপ্রদ অংশ থেকে পৃথিবী সৃষ্টি হল।’ (ঋগ্বেদ, ১০/৭২/৪)। ‘তারপর সৃষ্ট ক্ষেত্রে সাত ধাপে সংকোচন-প্রসারণ সম্পন্ন হল। তারপর সৃষ্টি হল ভারসাম্যের।’ (ঋগ্বেদ, ১০/৭২৮-৯)। একই কথা আরেকটি সূক্তে বলা হয়েছে, ভুরি পরিমাণ জল সমস্ত বিশ্বভূবন আচ্ছন্ন করে ছিল, সেখানে অগ্নির উৎপত্তি হয়। এভাবে গলিত উত্তপ্ত তরল থেকে প্রাণরূপ দেবতার উদ্ভব হয়। (ঋগ্বেদ, ১০/১২১/৭)।

আর বাইবেলে বলা হয়েছে ‘ঈশ্বর মাটি থেকে মানুষ সৃষ্টি করলেন এবং তার নাক দিয়ে জীবনের নিঃশ্বাস ফুঁকে দিলেন, আর মানুষ জীবন্ত হল’ (জেনেসিস ২ : ৭)। আদিপুস্তক-এর ‘জগৎ-সৃষ্টির বিবরণ’-এ বলা হয়েছে ‘পৃথিবী ঘোর ও শূন্য ছিল, এবং অন্ধকার জলধির উপরে ছিল, আর ঈশ্বরের আত্মা জলের উপরে অবস্থিত ছিল।… পরে ঈশ্বর কহিলেন, জলের মধ্যে বিতান হউক, ও জলকে দুই ভাগে পৃথক করুক। ঈশ্বর এইভাবে বিতান করিয়া বিতানের ঊর্ধ্বস্থিত জল হইতে বিতানের অধঃস্থিত জল পৃথক করিলেন; তাহাতে সেইরূপ হইল। পরে ঈশ্বর বিতানের নাম আকাশমণ্ডল রাখিলেন।’Icon of Judaism

পবিত্র কোরআনেও বলা হয়েছে ছয় দিনে বা ছয় ধাপে আসমান এবং জমিন সৃষ্টি করা হয়েছে। কোরআনে বলা হয়েছে- ইন্না রাব্বাকুমুল্লাহুল্লাযী খালাক্বাছ ছামাওয়াতি অলআরদ্বা ফী ছিত্তাতি আইয়্যামিন ছুম্মাতাওয়া আলাল আরশি ইয়ুগশিল লাইলান নাহারা ইয়াত্বলুবুহু হাছীছাওঁ আশ্শামছা আলক্বামারা আননুজুমা মুছাখ্খারাতিম বিআমরিহ; আলা লাহুল খালকু আলআমর; তাবারাকাল্লাহু রাব্বুল আ’লামীন। (কোরআন ৭:৫৪ )

অর্থাৎ নিশ্চয় তোমাদের রব আল্লাহ, যিনি আসমান ও জমিন ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন, তারপর তিনি আরশের উপর সমাসীন হন। তিনিই আবৃত করেন রাত্রি দ্বারা দিনকে যাতে তাদের একে অন্যকে দ্রুত গতিতে অনুসরণ করে, তিনিই সৃষ্টি করেছেন সূর্য, চন্দ্র ও নক্ষত্ররাজি, যা তাঁরই আদেশের অনুবর্তী। জেনে রেখ, তাঁরই কাজ সৃষ্টি করা এবং আদেশ প্রদান করা। আল্লাহ্ বরকতময়, সারা জাহানের প্রতিপালক (ইফা)। দেখা যাচ্ছে সৃষ্টি তত্ত্বে বাইবেল বর্ণিত পৃথিবী ছয় দিনে সৃষ্টির প্রদেয় তথ্যের সাথে কোরআনে কোন পার্থক্য করা হয়নি।

তবে বাইবেলের ঈশ্বর আদিম জলরাশিকে মঞ্চের সাহায্যে দু-ভাগ করে, যার ওপর স্থাপন করেন গগনমণ্ডল। ব্যাবিলনি সৃষ্টিতত্ত্বের তিয়াওয়াথের লাশ দু-ভাগ করার সাথে এর মিল আছে। বাইবেলে আছে, ‘পরে ঈশ্বর কহিলেন, দীপ্তি হউক; তাহাতে দীপ্তি হইল।’

হিন্দু মতে, হজরত নূহকে মনু (আদি পিতা) বলা হয়েছে। মনু থেকে মানব জাতির উদ্ভবও বলা হয়েছে (মনু > মানব)। এই মানব শব্দেরই বিবর্তিত আধুনিক রূপ মানুষ।

মুসলিম মতে, আদমই আদিপিতা। আর আদম থেকেই আদমি (মানে মানুষ) কথাটির উৎপত্তি। ইহুদি-খ্রিষ্টান-মুসলমান মতেও নূহকে ‘দ্বিতীয় আদম’ বলা হয়েছে। ‘আদম’ শব্দটির উৎস হচ্ছে হিব্রু শব্দ ‘আদামা’, ‘আদামা’ অর্থ মৃত্তিকা। আদম শব্দটি ইহুদি-খ্রিষ্টান-মুসলিম পরিশেষে মানব জাতির আদি পিতা অর্থে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। সে মতে শব্দটি নামবাচক। কিন্তু শব্দটির উৎপত্তি নিয়ে নানা কথা চালু রয়েছে। তখন তা আর শুধু নামবাচক মনে হয় না। কারো মতে শব্দটি আরব, কারো মতে অনারব তথা হিব্রু। এদিক থেকে আদম শব্দের আবিধানিক অর্থ সভ্যতা। আরবি ছাড়াও হিব্রু, সুরিয়ানি প্রভৃতি ভাষায় আদম শব্দটি ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

বিভিন্ন ধর্ম বিশ্বাসে মহাপ্লাবন :

হজরত নূহ (আ.) এঁর কালে যে মহাপ্লাবন হয়, অনুমিত হয়, তাতে পৃথিবীর জীবজন্তু ইত্যাদি এমনভাবে বিপর্যস্ত হয় যে, তার কোন চিহ্ন অবশিষ্ট থাকে না। তবে হজরত নূহ আল্লাহর নির্দেশ মোতাবেক জাহাজ তৈরি করে সৃষ্টি জগতের যে সামান্য নমুনা উদ্ধার করতে সমর্থ হন, তা থেকে নতুন সৃষ্টিজগতের পত্তন হয়। এই হিসেবে তাঁকে মানব জাতির আদি পিতা বলা হয়।

হিন্দু পুরাণেও মনুরকালে মহাপ্লাবনের উল্লেখ আছে। বাইবেল-কুরআনে তার বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়। এই মহাপ্লাবনকে বাইবেলে বলা হয়েছে তুফান (deluge)। সাম্প্রতিককালে কুরআন-বাইবেল বর্ণিত তথ্যের আলোকে দুজীপর্বত/আরারাত পর্বতমালার শীর্ষ থেকে এই কথিত নূহের জাহাজের ধ্বংশাবশেষ উদ্ধার করা হয়েছে। স্থানটি বর্তমানে আর্মেনিয়া দেশের অন্তর্গত। কোন কোন নৃবিজ্ঞানী মনে করেন, হজরত নূহের বংশধর ও উত্তর পুরুষগণ এই এলাকা থেকেই পরবর্তীকালে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমান বিশ্বে এই নূহের বংশধরগণই বসবাস করছে। বর্তমান ইন্দো-ইউরোপীয় জাতিসমূহ ও ভাষাগোষ্ঠীসমূহ এই নূহের উত্তরাধিকারী। যেমন : হাম, সাম, ইয়াপেচ/যেত। এঁরা হজরত নূহের তিন পুত্র। এঁদেরই নামান্তর আর্যজাতি।Icon of Christianity

বর্তমান ভারত, পাকিস্তান বাংলাদেশ হল- হিন্দুস্তানী আর্য; ইরান (পারস্য) ইরানীয় আর্য; মঙ্গোলিয়া (চিন) মঙ্গোলীয় আর্য; হাবসী—আফ্রিকীয় জাতি ইত্যাদি। সংক্ষেপে এদের ইন্দো-ইউরোপীয় জাতি বলা হয় (Indo-European Race)। এদের ভাষাকেও বলা হয় ইন্দো ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠী। (Indo-European Language)।

কাসাসুল আম্বিয়া (নবী কাহিনী)তে মঙ্গোলীয়দের বলা হয়েছে ‘ইয়াজুজ মাজুজ’। কোরআনে এদেরই আদি পিতা হজরত ইব্রাহীম নামে পরিচিত (আবীকুম ইব্রাহীম)। হজরত ইব্রাহীমের পুত্র ইসমাইল ও ইসহাকের বংশধর বনু ইসমাইল ও ইসরাইল গোষ্ঠীর উত্তর পুরুষরা বর্তমান বিশ্বে সংখ্যায় সর্বাধিক। উল্লেখ্য, জ্যেষ্ঠপুত্র ইসমাইলের বংশ হজরত মুহম্মদ (স.) (৫৭০-৬৩২ খ্রি.) আরব দেশে মক্কা নগরে জন্মগ্রহণ করেন এবং বনু ইসরাইল বংশ মধ্যপ্রাচ্যে বায়তুল মুকাদ্দিসকে কেন্দ্র করে ইসরাইল রাষ্ট্র গড়ে ওঠে। এঁদেরই আদি পিতা হজরত মুসা। মুসার পরে দাউদ-সুলায়মান প্রভৃতি। আর কুরআনে ইব্রাহীম ও মুসার প্রতি সহীফা (কিতাব) নাজিল করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। [‘ফী সুহূফে ইব্রাহীম ওয়া মুসা’]।

মুসার পরে তাঁরই বংশে দাউদকে সাম কিতাব দেওয়া হয়েছে [Psalms of David]। নামান্তর যবুর কিতাব। উল্লেখ্য, ভারতীয় দ্বিতীয় বেদের নামও সাম অর্থ একই-গান (Psalms)। [সূত্র : মুসলিম সুফিতত্ত্বে ‘সমাধান’]। উল্লেখ্য, দাউদের কিতাব যবুর মূল খ্রিষ্টীয় বাইবেল কিতাবের অন্তর্ভুক্ত (তৌরাত, যবুর ও ইঞ্জিল)। এগুলি একত্রে বাইবেল নামেই কথিত (Old and New Testament)। শুধু মুসার কিতাব তৌরাত : দাউদের কিতাব যবুর ও ঈসার কিতাব ইঞ্জিল নামে কথিত।

ইব্রাহীমের কিতাবই মূলগ্রন্থ বেদ (ঋক, সাম, যজু ও অথর্ব) নামে কথিত। হিন্দু শাস্ত্রানুসারে সনাতন যুগে ব্রহ্মা, ত্রেতা যুগে রামচন্দ্র, দ্বাপরে শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব ঘটে এবং কলিতে বুদ্ধ ও কল্কীর আবির্ভাব ঘটে। এই চার যুগে দশজন অবতারের আগমন হয়। যথা

‘মৎস কুর্মো বরাহশ্চ নরসিংহোহত বামনাঃ।

রামো রামশ্চ রামশ্চ বুদ্ধঃ কল্কি চ’৷৷

সামবেদের বীজমন্ত্ররূপে ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বর সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয়ের কর্তার নামের আদ্যাক্ষর যুক্তমন্ত্র সন্নিবেশিত হয়েছে- ‘ওঁ’ / ওম্ (womb)।

ওঁ কে বলা হয়ে থাকে অক্ষরব্রহ্ম। সনাতন ধর্মানুসারিরা মঙ্গলকার্যে মন্ত্র উচ্চারণ করতে এর ব্যবহার করে থাকেন। শুধু সনাতন ধর্মেই না, শিখ ধর্মও প্রতিষ্ঠিত ‘ইক ওমকার’ বা এক ওম (ওঁ)-এর ভিত্তিতে। বাহাই ধর্মেও রয়েছে আত্ম উদ্‌গত মনুষ্য মহিমাদীপ্তির অন্তর্নিহিত ব্যঞ্জনা। ইংরেজিতে ‘omni’ শব্দটা কোন কিছুর বিশালতা, অসীমতা বুঝাতে ব্যবহার করা হয়, সেটা ওই ও থেকেই আগত। যেমন- omnipresent, omnipotent ইত্যাদি।

ওঁ-এর প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় বেদে এবং পরবর্তীকালে উপনিষদেও এর কথা বলা হয়েছে। যর্জুবেদের ২:১৩, ৪০:১৫, ৪০:১৭ এবং ঋগবেদ : ১:৩:৭ এ ওঁ-এর উল্লেখ আছে । মাণ্ডুক্য উপনিষদ কেবল ওঁ এর মহাত্ম্য বর্ণনাতে উৎসর্গ। (যোগ দর্শন ১:২৭-১:২৮) উচ্চারণের সময় এর তিনটি অংশ পাওয়া যায়-অ, উ, ম যেখানে অ-বিরাট, অগ্নি এবং বিশ্ব; উ-হিরণ্যগর্ভ, বায়ু এবং তৈজস; ম-ঈশ্বর, আদিত্য এবং প্রাজ্ঞ বুঝায়।

ওঁ শব্দটি সংস্কৃত ‘অব’ ধাতু থেকে উৎপন্ন, যা একাধারে ১৯টি ভিন্ন ভিন্ন অর্থে প্রযোজ্য। এই ব্যুৎপত্তি অনুযায়ী ওঁ-কার এমন এক শক্তি যা সর্বজ্ঞ, সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডের শাসনকর্তা, অমঙ্গল থেকে রক্ষাকর্তা, ভক্তবাঞ্ছাপূর্ণকারী, অজ্ঞাননাশক ও জ্ঞানপ্রদাতা। সর্বোপরি এটি সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয় সংঘটনকারী ঈশ্বরের প্রতীক। শ্রীকৃষ্ণ গীতায় বলেছেন, তিনি সকল শব্দ মধ্যে ওঁ। Big Bang Theory অনুসারে মহাবিশ্ব সৃষ্টির শুরুতে মহাবিস্ফোরণ হয়েছিল, String Theory অনুসারে এক ধরনের মৃদু শব্দ তথা নিম্ন কম্পাংকের অণুনাদের ফলে মহাবিস্ফোরণ ঘটেছিল, আর বেদ অনুসারে ওঁ শব্দের প্রভাবে সাতটি মহাবিস্ফোরণের ফলে মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয়েছে।

সনাতন ধর্মের সূত্র অনুসারে বিশ্বের প্রত্যেক রাত্রি শেষে যখন দিনের সূচনা হয় তখন আংশিক সৃষ্টি শুরু হয়। বিশ্বের জীবনীতে মোট দিনের সংখ্যা ৩৬,০০০। মহাবিশ্বের একদিন = ৪,৩২,০০০০০০০ বছর। বিশ্বের দিন শেষে যখন রাত শুরু হয় তখন খণ্ড প্রলয় বা আংশিক ধ্বংস শুরু হয়। বিশ্ব সারা রাত ধ্বংস অবস্থায় থাকে খণ্ড প্রলয়ের সময় সম্পূর্ণ বিশ্ব ধ্বংস হয় না। বিশ্বের উপরের চারটি স্তর যেমন- সত্যঃলোক, তপঃলোক, জনঃলোক,

মহঃলোক ধ্বংস হয় না, কিন্তু নিচের দশটি স্তরের গ্রহমণ্ডলী ধ্বংস হয়। সকল প্রাণির আত্মা ভগবান বিষ্ণুর কাছে ফিরে যায় এবং সমস্ত রাত সেখানে অবস্থান করে। বিশ্বের রাত (যা ৪৩২০০০০০০০ বছরের সমান) শেষ হলে পুনরায় বিশ্বের ধ্বংসপ্রাপ্ত গ্রহমণ্ডলীর সৃষ্টি শুরু হয় যাকে আংশিক পুনঃসৃষ্টি বলে।

বিশ্ব যখন সর্বতভাবে ধ্বংস হয় অর্থাৎ বিশ্বের ১৪টি স্তর ধ্বংস হওয়ার পর সম্পূর্ণ পুনঃসৃষ্টি শুরু হয় অর্থাৎ মহাপ্রলয়ের পর। মহাবিশ্বের সম্পূর্ণ জীবন ৩১,১০৪০০০০০০০০০০০ বছরের সমান। এই সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর মহাবিশ্ব সর্বোতভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়, যাকে মহাপ্রলয় বলে। এই সময় সকল প্রাণির আত্মা কৃষ্ণের ছায়ারূপ মহাবিষ্ণুর শরীরে আশ্রয় গ্রহণ করে এবং তারা মহাবিশ্বের পুনঃসৃষ্টি পর্যন্ত অপেক্ষা করতে থাকে।

ইসলামি পরিভাষায় এই সময়কালকে বলা হয়েছে ‘বরজখ’। যে সকল মানুষ ধর্মীয় জীবনযাপনের মাধ্যমে চিন্ময় জগতে যাওয়ার যোগ্যতা লাভ করেছে তাদের আত্মা মহাবিষ্ণুর শরীর থেকে কৃষ্ণের শাশ্বত ধাম চিন্ময় জগতে প্রবেশ করে নিত্য জীবন লাভ করে আর যাদের জড় জগত ভোগের বাসনা থাকে অর্থাৎ সঠিকভাবে ধর্মীয় জীবনযাপন করেননি— তাদের পরবর্তী সৃষ্টি পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়, যা ৩১,১০৪০০০০০০০০০০০ বছর পর আবার আরম্ভ হয়। আধুনিক মহাবিশ্ব (Cosmology) গবেষণাবিজ্ঞানীরা এই গবেষণায় যে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন তাঁরা এর নাম দিয়েছেন অসিলেটিং মহাবিশ্ব মডেল (Oscillating Universe Model)।

ধর্মের উৎপত্তির ইতিহাস বিষয়ে সহায়ক গ্রন্থাবলি : 

E. G. White, In the Beginning: Patriarch and Prophets, World’s Last Chance Prepare to Meet your God; United States of America, 2008

Charles Darwin, The Origin of Species by Means of Natural

Selection, Murray, 1859.

পবিত্র বাইবেল (পুরাতন ও নুতন নিয়ম); বাংলাদেশ বাইবেল সোসাইটি, ঢাকা মোহাম্মদ সফিউল আলম, কোরানের আলোকে স্রষ্টা ও সৃষ্টি; ইসলামিক পাবলিকেশন্স লিঃ; চট্টগ্রাম, ১৯৭৭

অ্যালবার্ট আইনস্টাইন, ধারণা ও মতামত (ভাষান্তর : অনিল দাস), নয়া প্রকাশ, কলকাতা ১৯৯৯।

এফ, এঙ্গেলস : এ্যান্টি ডুরিং (অনুবাদ : সরদার ফজলুল করিম), বাংলা একাডেমী, ঢাকা, ১৯৮৫।

ফিওদর করোভনিক, পৃথিবীর ইতিহাস : প্রাচীন যুগ, প্রগতি প্রকাশন, মস্কো-১৯৮৬।

মোঃ জাকারিয়া কামাল, কোরআন ও বিজ্ঞানের আলোকে মানুষ ও মহাবিশ্বের সৃষ্টি রহস্য; আগামী প্রকাশনী, ঢাকা, প্র. প্র. ১৯৯২

ভবানীপ্রসাদ সাহু, ধর্মের উৎস সন্ধানে; উজ্জ্বল সাহিত্য মন্দির, কলকাতা, ২০০১

ড. সৈয়দ কামাল আহমেদ, সৃষ্টির রহস্যে মানব; ফ্রেন্ডস বুক কর্নার, ঢাকা, ২০১৯

[ ধর্মের উৎপত্তির ইতিহাস (The Advent of Religion) ]

আরও পড়ুন:

মন্তব্য করুন