৫ মার্চ ১৯৭১ | আন্দোলনের চতুর্থ দিন, মৃত্যু ছাপিয়ে ক্ষোভ | বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস

৫ মার্চ ১৯৭১ | আন্দোলনের চতুর্থ দিন, মৃত্যু ছাপিয়ে ক্ষোভ | বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস

 

স্বাধীনতাযুদ্ধে বিজয়ের পেছনে ছিল দেশ-বিদেশের বহু মানুষের একক ও মিলিত চেষ্টা এবং অজস্র ঘটনা। এখানে রইল মুক্তিযুদ্ধের প্রত্তেকটি দিনের বিবরণ।

 

আন্দোলনের চতুর্থ দিন, মৃত্যু ছাপিয়ে ক্ষোভ

 

আন্দোলনের চতুর্থ দিন
আন্দোলনের চতুর্থ দিন

 

৫ মার্চ ছিল একাত্তরের উত্তাল মার্চের পঞ্চম আর লাগাতার হরতালের চতুর্থ দিন। ঢাকাসহ সারা দেশে পূর্ণ হরতাল, স্বাধিকারকামী জনতার বিক্ষুব্ধ মিছিল, গণজমায়েত ও শপথের মধ্য দিয়ে বাংলার মুক্তি আন্দোলনের দিনটি অতিবাহিত হয়। বিভিন্ন স্থানে ক্ষুব্ধ জনতা পাকিস্তানি পতাকা ও মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবিতে আগুন দেয়।

সকালে সেনাবাহিনীর গুলিতে টঙ্গী শিল্প এলাকায় ৪ জন শ্রমিকের মৃত্যু ও ২৫ জন আহত হন। এ ঘটনায় ঢাকায় মানুষ বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। ছাত্রলীগের উদ্যোগে ছাত্র-জনতা টঙ্গীর নিহত শ্রমিকদের লাশ নিয়ে ঢাকায় মিছিল বের করে। গুলিতে চট্টগ্রামে তিনজন নিহত হয়। বিগত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আরও ১৪ জন আহত ব্যক্তির মৃত্যু ঘটে।

এদিন পর্যন্ত চট্টগ্রামে আন্দোলনে মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৩৮। গুলিতে খুলনায় দুজন ও রাজশাহীতে একজন নিহত হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জানান, কেবল ঢাকা ও আশপাশেই সেনাবাহিনীর গুলিতে কমপক্ষে ৩০০ জন প্রাণ হারিয়েছে এবং ২০০ জন আহত হয়েছে।

মসজিদে মসজিদে জুমার নামাজের পর শহীদদের আত্মার শান্তি কামনা করে বিশেষ মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকাসহ সারা দেশে প্রতিবাদ সভা ও শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়।

ছাত্রলীগ ও ডাকসুর উদ্যোগে বায়তুল মোকাররম প্রাঙ্গণ থেকে ছাত্রছাত্রীরা লাঠিসোঁটা নিয়ে মিছিল বের করেন। ছাত্র ইউনিয়নের (মতিয়া) উদ্যোগে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অনুষ্ঠিত হয় ছাত্রজমায়েত। পাকিস্তান লেখক সংঘ গণহত্যার প্রতিবাদে দেশজুড়ে মিছিল বের করে। বিকেলে কবি, সাহিত্যিক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা রাজপথে মিছিল করেন।

লাহোরে আন্দোলনে নিহত শহীদদের গায়েবানা জানাজা ও বিভিন্ন মসজিদে সংকটময় মুহূর্তে দেশের সংহতির জন্য বিশেষ মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়।

 

বঙ্গবন্ধুর ৬ দফা কর্মসূচি [ 6 points programme of bangabandhu ]
বঙ্গবন্ধুর ৬ দফা কর্মসূচি [ 6 points programme of bangabandhu ]

পিপিপির বক্তব্য

পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভুট্টো রাওয়ালপিন্ডির প্রেসিডেন্ট ভবনে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সঙ্গে পাঁচ ঘণ্টার বেশি সময় আলোচনা করেন। তাঁদের আলোচনা শেষে পার্টির মুখপাত্র আবদুল হাফিজ পীরজাদা বলেন, জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত রাখা নিয়ে আওয়ামী লীগের প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত অবাঞ্ছিত ও অযৌক্তিক। অধিবেশন স্থগিত রাখার জন্য পিপলস পার্টিকে দায়ী করা সংগত নয়।

পীরজাদা বলেন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে আলোচনার জন্যই পিপিপি জাতীয় পরিষদের উদ্বোধনী অধিবেশন কিছুদিনের জন্য স্থগিত রাখার অনুরোধ জানিয়েছিল। তার অর্থ এই নয় যে জাতীয় পরিষদ ভেঙে দেওয়া হয়েছে। পূর্ব পাকিস্তানে যেসব ঘটনা ঘটেছে, সে জন্য পিপিপি দায়ী নয়। আওয়ামী লীগের শাসনতান্ত্রিক প্রস্তাব পাকিস্তানের সংহতি রক্ষা করতে পারবে কি না, তা নিয়ে পিপিপি সন্দিহান। এ জন্যই ভুট্টো অধিবেশন স্থগিত রাখার দাবি জানিয়েছিলেন।

গণহত্যা বন্ধে তাজউদ্দীনের আহ্বান

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ এদিন এক বিবৃতিতে বলেন, ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, রংপুর, সিলেটসহ বাংলাদেশের অন্যান্য স্থানে মিলিটারির বুলেটে নিরীহ-নিরস্ত্র মানুষ—শ্রমিক, কৃষক ও ছাত্রদের হত্যা করা হচ্ছে। অবিলম্বে এই নরহত্যা বন্ধ করতে হবে। যারা এ ঘটনার জন্য দায়ী, তাদের জানা উচিত যে নির্বিচার নিরীহ-নিরস্ত্র মানুষকে এভাবে হত্যা করা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ ছাড়া আর কিছুই নয়। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষের ওপর আজ যে নির্যাতন নেমে এসেছে, তাঁরা বীরের মতো তা প্রতিরোধ করছেন। আজ আবালবৃদ্ধবনিতা-নির্বিশেষে প্রত্যেক মানুষ মুক্তি অর্জন এবং এক স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক হিসেবে বেঁচে থাকার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

 

তাজউদ্দীন আহমদ
তাজউদ্দীন আহমদ

 

বঙ্গবন্ধুর আলোচনা ও বিবৃতি

রাতে এক বিবৃতিতে বঙ্গবন্ধু বলেন, শেখ মুজিব ভুট্টোর সঙ্গে ক্ষমতা ভাগ-বাঁটোয়ারা করতে রাজি আছেন বলে বিদেশি বেতারে যে খবর বেরিয়েছে, সেটা ‘অসদুদ্দেশ্যমূলক’ ও ‘কল্পনার ফানুস’। তিনি বাংলাদেশে নির্যাতন-নিপীড়ন বন্ধের জন্য যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি পাকিস্তান সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির অনুরোধ জানানোর কথাও সরাসরি অস্বীকার করেন।

এয়ার মার্শাল (অব.) আসগর খান বিকেলে করাচি থেকে এদিন ঢাকায় পৌঁছান। রাতে তিনি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাঁর ধানমন্ডির বাসভবনে সাক্ষাৎ করেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান [ Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman ] তাজউদ্দীন আহমদ [ Tajuddin Ahmed ]
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান [ Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman ] তাজউদ্দীন আহমদ [ Tajuddin Ahmed ]

 

আরও দেখুন…

মন্তব্য করুন